অবশেষে প্রতীক্ষিত রাজনৈতিক সংলাপ ও কিছু কথা—এ.কে.এম শামছুল হক রেনু

রাজনৈতিক জটিলতাই নহে, যেকোন সমস্যা ও অমীমাংসার সমাধানের ব্যাপারে আবহমান কাল থেকেই উভয় পক্ষ বা একাধিক পক্ষের মধ্যে আলাপ আলোচনা বা সংলাপ একটি উত্তম পন্থা হিসেবে বিবেচিত। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন দাবী দাওয়া ও রফাদফার ব্যাপারে সরকারি দল আওয়ামী লীগ- ১৪ দলীয় মহাজোট, অপরদিকে বিএনপি- ২০ দলীয় জোটের মধ্যে অনেকদিন যাবৎ যথেষ্ট টানাপোড়ন চলে আসছে। এরই মধ্যে গণফোরাম, বিএনপি, জাতীয় ঐক্য, জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হলে ৭ দফা এবং ১১ দফার লক্ষ্যে সরকারি দলের সাথে আলোচনা বা সংলাপের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। যার ফলে সরকারি দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ০১/১১/১৮ ইং বৃহস্পতিবার গণভবনে আনুষ্ঠানিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

তাতে সরকারি দলের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলীয় মহাজোটের নেতৃবৃন্দ এবং অপর দিকে নেতৃত্ব দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেনসহ বিএনপি ও ফ্রন্টের শরিক অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দ। প্রতীক্ষিত এই সংলাপকে দেশের রাজনৈতিক, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিসহ অনেকেই কাংখিত ও আশার আলো হিসেবে দেখে থাকেন।

০২/১১/১৮ ইং শুক্রবার, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই সংলাপের ফলাফল দেখে দেশের সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অনেক দল ও দেশবাসী বিষ্ময় প্রকাশ করে থাকে। দেখা যায়, প্রতীক্ষিত সংলাপে ৭ দফার দাবী দাওয়ার ব্যাপারে কোনো ফয়সালা হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ তাতে অসন্তোষ্টি অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন এবং অপর দিকে সরকারী দলের পক্ষে বলা হয়, এ ব্যাপারে আরও আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় আসন্ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ব্যাপারে ধারাবাহিকতা হিসেবে নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতির সাথে ০১/১১/১৮ ইং বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে এক সভায় মিলিত হয়। তাতে রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে ইসি ও সিইসি ০৪/১১/১৮ ইং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন বলে জানা যায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, সংলাপ চললেও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং সিইসি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রদত্ত ভাষণে নির্বাচনের দিন তারিখ জানানো হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন সূত্রে ০৮/১১/১৮ ইং নির্বাচনের তফসিল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডিসেম্বরের ২২, ২৩ তারিখের মধ্যে নির্বাচনের দিন তারিখ ঘোষনার কথাও জানা যায়।

০২/১১/১৮ ইং শুক্রবার যুক্তফ্রন্টের নেতা বি. চৌধুরী ও অন্যান্যরা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্যদের সাথে সংলাপে বসে তাদের রফাদফা উপস্থাপন করে থাকেন। কিন্তু ০৩/১১/১৮ ইং বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা যায়, এ সংলাপেও সন্তোষজনক তেমন কিছু দেখা যায়নি। ০৫/১১/১৮ ইং জাতীয় পার্টির নেতা, ১৪ দলীয় মহাজোটের অন্যতম শরিক ও ৫৮ দলীয় সম্মিলিত জাতীয় জোটের প্রধান এইচ.এম এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল নিয়ে সংলাপে অংশগ্রহন করেন।

তাছাড়া সিপিবি বাসদসহ ৮ দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী ঐক্যজোটের নেতৃবৃন্দ পৃথকভাবে ০৬/১১/১৮ ইং প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে অংশ নেন। এরই মধ্যে ০১/১১/১৮ ইং বৃহস্পতিবার রংপুরের পর্যটন মোটেলে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনায় এইচ.এম এরশাদ বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবীর কোনটাই মানা সম্ভব নহে। তিনি আরও বলেছেন, ইভিএম নিয়ে (ঊষবপঃৎড়হরপ ঠড়ঃবরহম গধপযরহব) আমি প্রথম থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছি। কারণ ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হলে সেই ভোটে কারচুপি সম্ভব। আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় হয়েছে। এরশাদ আরও বলেছেন, আমার দলের নেতাদের নিয়ে ৫ নভেম্বর গণভবনে যাব, তবে সংলাপ করতে নয়, শুভেচ্ছা জানাতে এবং চা খেতে যাব। ০৫/১১/১৮ ইং গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপের কথা থাকলেও ঐ দিনই (০৬/১১/১৮ ইং মঙ্গলবার) দেশব্যাপী পদযাত্রা ও গণসংযোগ কর্মসূচীর ডাক দিয়েছে ৮ দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট। তাদের দাবীগুলোর মধ্যে রয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, বর্তমান সরকার পদত্যাগ করে দল নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুণৎগঠন, ইভিএম ব্যবহার না করা, না ভোটের বিধান চালুসহ বিভিন্ন দাবী।

০২/১১/১৮ ইং শুক্রবার গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার বোনার পাড়ায় এক জনসভায় ১৪ দলীয় মহাজোটের শরিক ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, সংলাপও চলবে নির্বাচনও যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। এ কথার অন্তরালে তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন, তা বোধগম্যে অনেকের মাঝেই নানা কথার দানা বাধতে শুরু করেছে। কারণ অনেকেই মনে করে থাকে আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে দফারফা ফয়সালা না করে যদি নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করা হয়ে থাকে তবেতো ফয়সালার আর কিছু অবশিষ্ট না থাকারই কথা। আর যদি ঘোষিত তফসিল স্থগিত রেখে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পুণরায় নতুন তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তবে সেটা অন্য কথা।

জানা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা হয়নি। এ অবস্থায় নির্বাচনের তফসিল না দেয়ার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন ০৩/১১/১৮ ইং শনিবার সিইসিকে চিঠি দিয়েছেন। আরও জানা যায়, ০১/১১/১৮ ইং বৃহস্পতিবার দুপক্ষের সংলাপে ড. কামাল হোসেন উল্লেখ করেছিলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৯টি সংসদ নির্বাচনে সংসদ ভেঙে দেয়া অবস্থায়ই অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালেও গণপরিষদ ভেঙে গিয়েই দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের (খ) উপধারা অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার বিধান রয়েছে। সুতরাং সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করা সংবিধান সম্মত ও সঙ্গতিপূর্ণ বলেও তিনি মনে করেন।

সংলাপ নিয়ে একটি উদাহরণ না দিলেই নয়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে (জাতীয় সংসদ নির্বাচন) আওয়ামী লীগ সারা পাকিস্তানে নিরংকুশ ভোটে জয় লাভ করে থাকে। যাকে বলা হয় ট্রেমেন্ডাস ভিক্টোরি (ঞৎধসবহফড়ং ঠরপঃড়ৎু)। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যাপ (ওয়ালী), মুসলীম লীগ (কাইয়ুম), পিডিপি (নসরুল্লাহ)সহ আরও কিছুদল থাকলেও জুলফিকার আলী ভূট্টোর পিপিপি (চধশরংঃধহ চবড়ঢ়ষবং চধৎঃু- চচচ) শুধু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিরংকুশভাবে জয়লাভ করে থাকে। তখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট দল আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করার কথা। যার প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ (১৯৭১) সংসদ অধিবেশনের ঘোষণা দিয়েও তা আবার পরবর্তী সময় এক তোঘলকি ফরমানে স্থগিত ঘোষণা করে থাকে। এ নিয়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। যার ফলে জেনারেল ইয়াহিয়া ও ভূট্টো পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ট দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ও মীমাংসার কথা বলে ঢাকায় আসে। তখন ঢাকার কুর্মিটোলা বিমান বন্দরে নেমেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে ঘোষণা করে “মুজিব ভাবী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী”। যার সবই ছিল তাদের ক্যামোফ্ল্যাক্স, হিপক্রেসি ও গভীর ষড়যন্ত্র। তারপর ১৬ মার্চ (১৯৭১) থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হাউজে ইয়াহিয়া, ভূট্টো ও অন্যরা বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে।

অপরদিকে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে রাতারাতি তাদের অর্থকড়ি ও সোনাদানা নিয়ে যেমনি পাকিস্তানে সরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয় তেমনি রণতরি সোয়াতের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ বুঝাই করে চট্টগ্রাম বন্দরে আনার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। যার মধ্যে সবটাই ছিল সংলাপ দীর্ঘায়িত করার পেছনে ইয়াহিয়া ভূট্টোর কুটচাল ও ষড়যন্ত্র। যা ছিল সংলাপের নামে ঘুম পাড়ানির নাটক। যদিও শান্তি ও সমঝোতার লক্ষ্যে এই সংলাপকে একেবারে খাটো করে দেখারও সুযোগ ছিল না। পরবর্তী সময় নাটের গুরু ভূট্টো ও ইয়াহিয়ার নিগৃহীত ষড়যন্ত্রে যা হয়েছিল সে ইতিহাস যেমনি হৃদয় বিদারক তেমনি মমস্পর্শী। যার বর্ণনার ভাষা নেই। ইতিহাস যুগ যুগ ধরে সংলাপের নামে এটাকে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখবে এবং ঘৃণার চোখে পর্যালোচনা করবে এটাই বাস্তব সত্য। সংক্ষিপ্ত কলামের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের হিং¯্র হায়েনা, নররাক্ষস ও জল্লাদদের আদ্যোপান্ত ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যপটের দিকে যেতে আজও শরীর শিহড়িয়ে ওঠে।

যাহোক বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক সংলাপ ব্যর্থতার সংক্ষিপ্ত কিছু না বললেই নয়। ১৯৯৪, ১৯৯৫, ২০০১, ২০০৬ ও ২০১৩ সালের রাজনৈতিক ব্যর্থ সংলাপের হালহকিকত তোলে ধরা হল। ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবী সামনে আনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে তারা দেশজুড়ে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। হরতাল ও সহিংসতায় জনজীবন যখন বিপর্যস্ত তখন এদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র সংহত করতে কমনওয়েলথের পক্ষ থেকে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে ১৯৯৪ সালের ১৩ অক্টোবর সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঢাকায় আসেন কমনওয়েলত মহাসচিবের বিশেষ দূত ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টেফান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি দফায় দফায় বৈঠক করেন। সর্বদলীয় একটি সরকার গঠনেরও তিনি প্রস্তাব করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে ফর্মুলা মানেনি। স্যার নিনিয়ান স্টেফানের বিরুদ্ধে তখন পক্ষপাতিত্বেরও অভিযোগ তুলেছিল আওয়ামী লীগ। ফলে সে উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কিন্তু কোনোরকম সমাধান দিতে না পেরে ফিরে যান নিনিয়ান স্টেফান।

১৯৯৪ সালের সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট গড়ায় ১৯৯৫ সালে। তবে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধী দরীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, রেহমান সোবহান, ফখরুদ্দীন আহমদ ও ফয়েজ আহমদ। সেই সংলাপও সফল হয়নি। এর ফলে আওযামী লীগের আন্দোলন আরও প্রবল হয়ে ওঠে। অবশ্য ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীতে একটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচন করা হয়। অবশ্য সে নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবী নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি আন্দোলন করে। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে মধ্যস্ততার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। কিন্তু তার এ চেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি। সংলাপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

২০০৬ সাল, এ নির্বাচনে উত্তপ্ত হয় রাজনীতি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধীদের আন্দোলনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগ ও সিইসি এম.এ আজিজের পদত্যাগের দাবী প্রবল হয়ে ওঠে। এতে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের মধ্যে বহুল আলোচিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। দফায় দফায় ম্যারাথন আলোচনা স্বত্বেও এ সংলাপও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৩ সালের শুরুতে অবাধ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে আন্দোলন জোরালো হয়। এ দাবীতে বিরোধী দল বিএনপির ডাকা হরতাল অবরোধের কারণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সহায়তা করতে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। এ সময়ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় সংলাপ হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ সংলাপও আগের সব সংলাপের মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অনেকেই মনে করে বর্তমান ৬ষ্ঠ সংলাপের যে হাবভাব তাও বিগত ৫টি ব্যর্থ সংলাপের চেয়ে দেশের মানুষের আশা ভরসা পূরণ করতে পারবে বলে খুব একটা মনে হয় না। তারপরও নিরাশার মাঝে যদি এ সংলাপের সফলতা আসে তবে এ জন্য উভয় পক্ষকেই সাধুবাদ।

যা হোক, বিভিন্ন সময়ে সংলাপ নিয়ে তিক্ততা জটিলতা থাকলেও, আলাপ আলোচনা ও সংলাপের মধ্যে নিহীত যে কোনো সমস্যা সমাধানের অন্যতম গণতান্ত্রিক পন্থা। আলাপ আলোচনায় বসলে অনেক বড় সমস্যাও অনেক সময় ছোট হয়ে আসে এবং কাছে এসে যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে ০১/১১/১৮ ইং ও যুক্তফ্রন্টের সাথে ০২/১১/১৮ ইং আলোচনার প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্যদের সাথে যে একটা ব্যবধান ছিল কিন্তু আলাপ-আলোচনা যাহাই হোক, তাদের মধ্যে কম হলেও একটা ভাব সৃষ্টি হয়নি তা বলা যাবে না। আসন্ন সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক, লেভেল প্লেসিং ফিল্ড ও গণতান্ত্রিক আদলে অনুষ্ঠিত হয়, এসব কিছু দেখার জন্য দেশের মানুষ কাংখিত আশা নিয়ে বসে আছে। নির্বাচন যাতে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং কোনো অবস্থাতেই যাতে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর মতো ১৫৩ জন বিনাভোটের এমপি এদেশের মানুষের ভাগ্যে আর দেখা না দেয় ইহাই জনপ্রত্যাশা।

অতীতের সংলাপের দৃশ্যপট থেকে বলা যায়, বিচার মানি তবে তালগাছটি আমার। এ প্রবণতা থেকে সরে না আসলে সংলাপ অতীতের মতো সংলাপই হয়ে থাকবে এবং অতীতের ব্যর্থ ৫টি সংলাপের সাথে বর্তমান সংলাপ সংযুক্ত হয়ে ৬টি ব্যর্থ সংলাপের ইতিহাস সৃষ্টি হবে। দরকার কাংখিত সংলাপের শান্তিপূর্ণ সমাধান, সাফল্য ও আগামী দিনের সুন্দর ও নতুন পথের দিকদর্শন। ক্ষমতা ভোগের নয়, ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল। কিন্তু সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে ০৭/১১/১৮ ইং বুধবার দ্বিতীয় দফার সংলাপটিও সফল হয়নি। তারপরও দেশের মানুষ আশাহত হয়নি।

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
লেখক কলামিষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *