আজ বিশ্ব নদী রক্ষা দিবস… মরছে নদ-নদী, ধুকছে চলনবিল 

॥ আবদুল মান্নান পলাশ ॥ ‘আমায় ভাসাইলি রে/আমায় ডুবাইলি রে/অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে..’। উর্বরা সমতলের বুকে বয়ে চলা মায়াবী নদীমাতৃক বাংলাদেশ। স্বচ্ছতোয়া জলের নীল ঢেউয়ে নদী বিধৌত পলিমাটির বুননে গড়া সোনার বাংলাদেশ। বাংলার জমিনে শিরা-উপশিরায় জালের মতো জড়িয়ে থাকা নদীতেই জীবনের কূল খুঁজে নিতে হয় বাঙালিকে। বাঙালির জীবনধারণ, জীবনাচারণ, ইতিহাস-ঐহিত্য, সংস্কৃতি সবই নদী মিশ্রিত, নদী আশ্রিত। নদীর ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে বাঙালির চিরায়ত জীবনধারা, পেয়েছে নিকট-নিজস্বতা। নদীর জলে অবগাহন-পরিশুদ্ধি, নদীর জলে চাষাবাদ, মিঠাপানির সুস্বাদু মাছ, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ যুগে যুগে এই বাংলাকে করেছে সমৃদ্ধশালী। নদী নিজেকে উজার করে দিয়েছে, আমরা শুধুই নিয়েছি। নদী বিলীন হচ্ছে, আমাদের বিরুপতায় বিপদাপন্ন হচ্ছি। যেমন দেশের বুহৎ জলাভূমি চলনবিল। মরছে তার বুকে বয়ে চলা নদ-নদী। ধুকছে মরমর চলনবিল।

 

বাংলাদেশের নদী মরে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ গবেষনা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন। পদ্মা ও যমুনার সংযোগকারী বড়াল নদের মুখে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত জলকপাট, ক্রস বাঁধ, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বড়ালের পানি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন ও পানিপ্রবাহ বাড়ানো হবে, সম্প্রসারণ হবে নৌপথ। প্রথম তিন বছর প্রকল্পের সুফল মিললেও এরপর থেকেই শুরু হয় বিপর্যয়। পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কম থাকার সময় বড়ালের মুখে জলকপাট বসানোয় পদ্মা থেকে বড়ালে পানিপ্রবাহ আরো কমে যায়। ফলে বহু স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। অন্যদিকে যমুনার যে অংশে বড়াল নদী মিশেছে সেখানে পানিপ্রবাহ নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন, ক্ষতিগ্রস্থ হয় যমুনাও। বড়াল শুকিয়ে শুকনা মাঠে পরিণত হয় কোথাও। আবার কোথাও অস্বাস্থ্যকর বর্জ ও কচুরিপানায় পরিবেশ দূষন ঘটায়। মৃত বড়ালের পেটে সেই সুযোগে হামলে পড়ে প্রভাশালী নদী খেকোদের দল।

চলনবিলে পানির অভাবে মিলছে না মাছ। কৃষিকাজেও বেড়েছে খরচ। এক সময় এখানে বড় বড় মহাজনী নৌকা-স্টিমার চলত। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমের আগেই হারিয়ে যায় এসব নদীর প্রাণ। হারিয়ে যেতে বসেছে বিলের বড়াল, গুমানী, করতোয়া, চিকনাই, নবগঙ্গা, নারোদ, নন্দকুজা, আত্রাই, মুছা খাঁ’র খাল, বেশানীর খাল, কিনু সরকারের জোলাসহ ছোটবড় অধিকাংশ নদ-নদী-খাল। চলনবিলের এসব নদীর আয়তন ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে যাচ্ছে মিঠাপানির দেশি প্রজাতির নানা রকম মাছ। সময়ের বিবর্তনে চলনবিল আজ মরে যাচ্ছে। এক সময় যে বিল পানিতে থৈথৈ করত সেখানে আজ সবুজ ফসলের সমারোহ। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই পানিশুন্য থাকে নদীগুলো। নদীর বুক চিরে রেললাইন ও মহাসড়ক নির্মাণসহ অপরিকল্পিতভাবে ব্রিজ-কালভার্ট, জলকপাট, বাঁধ-ক্রসবাঁধ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, দখলসহ নানা কারণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে। গ্রন্থিক দলিল ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলন্ত বিল থেকে চলনবিল নামের উৎপত্তি। চলনবিল মৎস্য ও শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত। হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠতো শীতকালে। ১৯০৯ সালের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের জরিপ অনুযায়ী প্রাচীন চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার। খরা মৌসুমে শুকিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে। ১৯৪০ সালে পূর্ববঙ্গ রেলওয়ে প্রচার বিভাগের তথ্যমতে, তখন এর আয়তন ছিল ৪৪১ বর্গমাইল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ আমলে চলনবিলের মাঝ দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ হতে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই বিলের অপেক্ষাকৃত উঁচু উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে ভাটা পড়ে। সেই থেকেই চলনবিলের আয়তন সংকীর্ণ হতে শুরু করে। ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মা নদীর পলি জমে গত কয়েক দশকে নদ-নদীগুলোর দক্ষিণাংশের প্রায় ২১ বর্গকিলোমিটার এলাকা শুকিয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক নির্মাণের পর পানি প্রবাহে আরও বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পলি জমে দ্রুত ভরাট হচ্ছে। পাউবো’র এক জরিপে আরও জানা গেছে, বিলে পানি সরবরাহকারী নদী দ্বারা বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয়। আর ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিভিন্ন নদী ও ক্যানেল দিয়ে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪.৮ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয় এই বিলে। এই পলি যদি ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সমভাবে বিস্তৃত করে দেওয়া হয় তাহলে প্রতি বছর এর উচ্চতা প্রায় ১.২৭ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়।

বিলের নদীগুলোর গড় প্রস্থতা ছিল ১ হাজার ৫০০ ফুট থেকে ২ হাজার ফুট। প্রতি বছর নদী দিয়ে এ বিলে ৬৩ লাখ ঘনমিটার পলি প্রবাহিত হয়ে থাকে। এরমধ্যে ১৫ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং না করায় নদ-নদী, খালগুলোর প্রস্থতা ও গভীরতা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে চলনবিলের বিভিন্ন স্থানের গভীরতা কমবেশি ১ দশমিক ৫৩ মিটার থেকে ১ দশমিক ৮৩ মিটার। চলনবিল মৎস্য প্রকল্পের সমীক্ষা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮২ সালে মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬১ জন জেলে এসব নদ-নদী, খাল থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কমতে কমতে সেই সংখা ২০০৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ সূত্র মতে ২০-২৫ বছর আগেও চলনবিলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে সারা বছর ধরেই ৬-৭ ফুট পানি থাকত। ফলে বছরজুড়েই নৌ-চলাচল করত। কিন্তু জলবায়ুর পরিবর্তন, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব, বিলের মধ্য যত্রতত্র রাস্তাঘাট, বন্যানিয়ন্ত্রন অবকাঠামো, নদী দখল করে বসতি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরির ফলে নদীগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। পদ্মা, যমুনা ও বৃহত্তম বিল চলনবিলের প্রধান সংযোগকারী নদী বড়াল যেটি রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মার শাখা হিসাবে উৎপত্তি হয়ে ২২০ কিলোমিটার পথ বেয়ে চলনবিলের ভিতর দিয়ে মুসা খাঁ, নন্দকুজা, চিকনাইসহ বেশ কয়েকটি নদীর জন্ম দিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির হুরাসাগর হয়ে যমুনায় মিশেছে। কিন্তু ১৯৮০ সালে উৎসমুখে ও ৪৬ কিলোমিটার ভাটিতে বড়াইগ্রামের আটঘড়িয়ায় মাত্র এক গেটের একটি জলকপাট নির্মাণ, পাবনার চাটমোহরে ৩ টি ক্রসবাঁধ ও একটি জলকপাট নির্মাণের কারণে একদার ¯্রােতশিনী বড়াল মড়াখালে পরিণত হয়ে পড়ে। বড়ালসহ চলনবিল রক্ষায় এলাকাবাসীর আন্দোলনের মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। নদী বিষয়ক টাস্কফোর্স ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় বড়াল নদীর সব বাঁধা কাগজ-কলমে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর নদীর চাটমোহ অংশে জলকপাটটি অপসারণ করা হয়। তিনটি ক্রসবাঁধ সরিয়ে দুটি সেতু নির্মান করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলনবিলকে রক্ষা করতে হলে যমুনা ও পদ্মা নদীসহ চলনবিলের প্রধান প্রধান নদী ও খাল ড্রেজিংয়ের আওতায় এনে পানির প্রবাহ সৃষ্টি ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। নদীগুলোর সীমানা চিহিৃত করতে হবে। জন-অংশগ্রহণের ভিত্তিতে চলনবিল অর্থরিটি প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্কারের অভাবে দ্রুতইত মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে নদীগুলো। তাই জেলার কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব এসএম মিজানুর রহমান বলেন, বড়ালসহ চলনবিলের নদী রক্ষায় এলাকাবাসীর আন্দোলনের মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড দহপাড়া জলকপাট অপসারণ করেছে। বোঁথড়, রামনগর ঘাটে সেতু হয়েছে। নতুন বাজারে এখনো সেতু হয়নি। বাঁধ কেটে এলাকাবাসী কাঠের সেতু করেছে । এতে নদীর প্রবাহমানতা ফেরেনি। পশ্চিমে নাটোরের দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আর নদীর সীমানা চিহিৃতকরণ, দখল উচ্ছেদ এবং খনন ছাড়া বড়ালে পানি আসবে না। আমরা একটা পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। এখনও অনেক কাজ বাঁকী। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রাজশাহী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাজিদুর রহমান বলেন, নদীতে বাঁধ বা জলকপাট নির্মাণে নদীর নাব্যতা কমার ধারণা সঠিক নয়। উজানে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বড়ালসহ চলনবিল এলাকার নদীগুলোর নাব্যতা কমে গেছে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তবে নদীর দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালু আছে। সেটি আরো জোরদার করা হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার আব্দুল মতিন বলেছেন, দেশের দুই বৃহৎ নদী পদ্মা-যমুনা ও বৃহত্তম বিল চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগকারী নদী হলো বড়াল। এটি রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মার শাখা হিসেবে উৎপন্ন হয়ে ২২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে চলনবিলের ভেতর দিয়ে বেশ কয়েকটি নদীর জন্ম দিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ির হুরাসাগর হয়ে যমুনায় মিশেছে। বড়ালের পথে পথে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বড়ালে যাতে পানি আসে আমরা সেই দাবী নিয়ে সরকারে সাথে কাজ করছি। কাজটি সহজ নয়। সময় লাগবে। ইতিমধ্যে বেশকিছু অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়েছে। এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে আমরা আছি বড়ালের পাশে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *