ইসলামে কুকুর নিধন কিভাবে দেখে

ধর্মপাতা: মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা: যেসব কুকুর দ্বারা মানুষের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলো মেরে ফেলার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অহেতুক কোনো কুকুরকে হত্যা করা যাবে না। আর একান্ত প্রয়োজনে যেগুলো পালন করতেই হবে, সেগুলো রাখতে হবে নিরাপদ দূরত্বে। প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম সদা যত্নবান পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য মহান আল্লাহ বহু প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে একটি হলো কুকুর, যাদের মানুষের কাছাকাছিই বেশির ভাগ সময় দেখা যায়। হাজার বছর ধরে এদের মানুষের বাড়িঘর, ফসল, গৃহপালিত পশু পাহারার কাজে ব্যবহার করা হয়। বর্তমান যুগে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কুকুরের ব্যবহার রয়েছে।

বিশ্বের সব দেশেরই বিভিন্ন বাহিনীতে রয়েছে ডগ স্কোয়াড, যেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরকে অপরাধী শনাক্ত করা, বিপজ্জনক বস্তু শনাক্ত করাসহ বিভিন্ন কাজ করানো হয়। একান্ত প্রয়োজনের তাগিদে কুকুর পালনে ইসলাম বাধা প্রদান করে না। কিন্তু শুধু শখের বসে বাসাবাড়িতে কুকুর রাখাকেও ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ এতে মানুষের বহু ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া হাদিসে এসেছে, ‘যে ঘরে কুকুর ও ছবি থাকে, সেই ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪১৫৩)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি শিকার করা বা গবাদি পশু পাহারা অথবা শস্যক্ষেত পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া কুকুর লালন-পালন করে, প্রতিদিন ওই ব্যক্তির দুই কিরাত পরিমাণ নেকি হ্রাস পায়।’ (তিরমিজি : হাদিস ১৪৮৭) হানাফি মাজহাব মতে, কুকুরের শরীর নাপাক নয়। তাই কুকুর কারো শরীর বা কাপড় স্পর্শ করলে তা নাপাক হবে না।

তবে কুকুরের লালা নাপাক। কুকুর মুখ দিয়ে কারো জামা টেনে ধরলে যদি কাপড়ে লালা লেগে যায়, তাহলে কাপড় নাপাক হয়ে যাবে; অন্যথায় নাপাক হবে না। (আল-বাহরুর রায়েক : ১/১০১, হিন্দিয়া : ১/৪৮, আদ্দুররুল মুখতার : ১/২০৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যদি তোমাদের কারো পাত্র থেকে কুকুর পান করে তাহলে সে যেন তার পাত্রটি সাতবার ধৌত করে। (নাসায়ি, হাদিস : ৬৩) অনেক সময় রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলোও অনেক ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

অলিগলির কুকুরের ভয়ে অনেকেই ফজর পড়ার জন্য মসজিদে যেতে সাহস করেন না। দিন দিন বেওয়ারিশ কুকুর বেড়ে যাওয়ায় বিপদের সমুখীন হতে হয় বহু পথচারীকে। ২০১৭ সালে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে এসেছে, ‘রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে গত ৯ মাসে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫১ হাজার ৩২১ জন। গত পাঁচ বছরে কুকুরে আক্রান্ত তিন লাখ ৩৫ হাজার ১৪৭ জন এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরের কামড় খেয়ে টিকা না নিলে মানুষেরও জলাতঙ্ক রোগ হয়। গত ৯ মাসে রাজধানী ও এর আশপাশে জলাতঙ্ক রোগে ১৩ জন মারা গেছেন। সারা দেশে গত পাঁচ বছরে এই রোগে মারা গেছেন ৪৪২ জন। এই তথ্য কেবল মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের। এর বাইরে সব জেলা হাসপাতালে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। সেই হিসাব ধরলে কুকুরে আক্রান্ত ও জলাতঙ্কের রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হবে।’

যদি কখনো এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখন তাদের পদক্ষেপ কী হবে, এ ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কুকুর মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অবশ্য শিকার ও ছাগপালের পাহারাদারির জন্য কুকুর রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছেন, কোনো পাত্রে যখন কুকুর মুখ দেয় তখন তা সাতবার ধৌত করবে এবং অষ্টমবারে মাটি দ্বারা মেজে নেবে। (বুখারি, হাদিস : ৬৭) অর্থাৎ যেসব কুকুর দ্বারা মানুষের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলো মেরে ফেলার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অহেতুক কোনো কুকুরকে হত্যা করা যাবে না। আর একান্ত প্রয়োজনে যেগুলো পালন করতেই হবে, সেগুলো রাখতে হবে নিরাপদ দূরত্বে। প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম সদা যত্নবান। কিন্তু কোনো প্রাণী যখন আশরাফুল মাখলুকাত মানুষের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার জন্য ভিন্ন বিধান দেওয়া হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *