ঈদের আনন্দ নেই বানভাসিদের

রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ : আর সাপ্তাহ খানেক পরে কোরবানি ঈদ। সিরাজগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি তাদের মনে নেই ঈদের কোনো আনন্দ। ভয়াবহ বন্যায় বানভাসিদের দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে।

ভয়াবহ বন্যার করাল গ্রাস তাদের সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বন্যা, নদী ভাঙন ওদের কোমর বাঁকা করে দেয় প্রতিনিয়ত। ভিজিএফ, ভিজিডি ও বয়স্ক ভাতার অনুদানই ওদের শেষ সম্বল। তাও আবার কখনো পান আবার কখনো তা পান না। তাই তাদের মনে নেই কোনো ঈদ আনন্দ, আছে শুধু দুঃখ আর বেদনা।

সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী ৩৩টি ইউনিয়নের ২১৬টি গ্রামের এক লাখ ৫৯ হাজার ১৫৩জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে তিন লক্ষাধিক মানুষ। চরে বসবাসকারী প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষের সবাই বেঁচে আছে সরকারি-বেসরকারি কিংবা বিভিন্ন এনজিও’র দেওয়া ত্রাণের উপর ভর করে।

সরেজমিনে গিয়ে বন্যায় পানিবন্দি মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতায় বেরিয়ে আসে তাদের জীবন-যুদ্ধের করুণ কাহিনী। ‘বেঁচে থাকার তাগিয়ে যে যা পারছে তাই করে কোনোরকম জীবিকা নির্বাহ করছে। আবার কেউ কেউ অনাহারে-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করছে।

বন্যা কবলিতরা বলেন, ঈদের আনন্দ করবো কি দিয়ে। দু’বেলা দুমুঠো পেটের ভাতই জোগাড় করতে পারি না। সেখানে ঈদের আনন্দ করার চিন্তা আনবো কি করে। ঈদকে সামনে রেখে মানুষ যখন আনন্দ নিয়ে ব্যস্ত তখন আমরা ঘরবাড়ি রক্ষা করা নিয়ে ব্যস্ত। সামনের দিনগুলা কেমনে চলমো সেই চিন্তায় আইতোত (রাতে) ঘুমেই আইসে না। এইবার বন্যায় আমাগো সর্বস্বান্ত করল। কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা ঈদের দিন পরিবারকে একটু সেমাই খাওয়াতে পারব কিনা জানি না।

শাহজাদপুরের কৈজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, চরের অভাবী মানুষগুলোর কাছে ঈদ যেন শুধুই স্বপ্ন। কারণ সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি সহায়-সম্বল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কৈজুরি ইউনিয়নে বেশিরভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। মৌসুমী খেতেও ভালো ফসল হয়ে থাকে। এলাকার মানুষ স্বচ্ছল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এ বছর বন্যার পানি উঠায় মানুষের ঘরে রাখা ধান-চালও নষ্ট হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রণজিৎ কুমার বলেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উঁচু স্থান ও স্কুল ঘরে আশ্রিত বানভাসি মানুষ এবং বন্যা কবলিত এলাকার বসতবাড়িতে থাকা পানিবন্দী মানুষের এবার ঈদের আনন্দ নেই। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা ও গো-খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। পানি কিছুটা কমলেও ভাঙ্গন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে যমুনা পাড়ের মানুষ।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, বন্যায় সিরাজগঞ্জে পাঁচ উপজেলার ৩০টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ এবং পাঁচটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ২২০টি বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ১০৬০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৬৮৪ পরিবার ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় রয়েছে। কোরবানি ঈদের আর বাকি মাত্র ২১-২২ দিন এর মধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও দুভোর্গের কারণে ঈদের আনন্দ নেই বানভাসিদের।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ডিডি) মো. হাবিবুল হক জানান, সিরাজগঞ্জে চরবাসীর বসবাসকারী মানুষের একমাত্র সম্বল চাষাবাদ। বন্যার কারণে চরের অভাবী মানুষগুলোর চাষাবাদ করতে পারছে না। বন্যার কারণে এবার চরঞ্চলবাসীর মনে নেই ঈদের আনন্দ। সিরাজগঞ্জ জেলার এবার বন্যা কবলিত পাঁচটি উপজেলার ১১ হাজার ১৭ হেক্টর জমির পাট, তিল ও আখ পানিতে ডুবে ক্ষতি হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *