ঋণের মামলায় পাবনার ১২ কৃষক জেলহাজতে ; গ্রেপ্তার আতঙ্ক এলাকাছাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক : পাবনার ঈশ্বরদীতে ৩৭ জন প্রান্তিক কৃষক বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক থেকে গ্রুপ ঋণ গ্রহণের পর অনেকেই ঋণ পরিশোধ করলেও অজ্ঞাত কারণে আদালতের ওয়ারেন্টে পুলিশ ১২ কৃষককে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘর ছাড়া বাকিরা। ঋণ পরিশোধের পর পাশ বই এবং কিস্তি আদায়ের রশিদ থাকার পরও মামলা ও গ্রেপ্তার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষক পরিবারের ক্ষুব্দ সদস্যরা।

গত বুধবার পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলায় এই ওয়ারেন্ট জারী করেন। পরে পুলিশ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ১২ জন কৃষককে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে।

ঈশ^রদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অরবিন্দ সরকার জানান, ২০২১ সালে ওই ৩৭ কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে আদালত গত বুধবার তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আদালতের আদেশের ভিত্তিতে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কৃষকেরা দাবি করেন, তাঁরা ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন। এরপর কেন মামলা হলো, তা তাঁরা জানেন না। তিনি বলেন, এই গ্রুপ লিডার স্থানীয় মহিলা মেম্বার বিলকিস বেগম ঘটনার মূল হোতা বলে জেনেছি। তিনিও ওয়ারেন্টভূক্ত আসামী। তাকে পুলিশ গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন; ঈশ^রদী উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারি গ্রামের শুকুর প্রামাণিকের ছেলে আলম প্রামাণিক (৫০), মনি ম-লের ছেলে মাহাতাব ম-ল (৪৫), মৃত সোবহান ম-লের ছেলে আবদুল গণি ম-ল (৫০), কামাল প্রামাণিকের ছেলে শামীম হোসেন (৪৫), মৃত আয়েজ উদ্দিনের ছেলে সামাদ প্রামাণিক (৪৩), মৃত সামির উদ্দিনের ছেলে নূর বক্স (৪৫), রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আকরাম আলী (৪৬), লালু খাঁর ছেলে রজব আলী (৪০), মৃত কোরবান আলীর ছেলে কিতাব আলী (৫০), হারেজ মিয়ার ছেলে হান্নান মিয়া (৪৩), মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মজনু হোসেন (৪০) ও মৃত আখের উদ্দিনের ছেলে আতিয়ার রহমান (৫০)। তাঁরা সবাই প্রান্তিক কৃষক।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে ভাড়ইমারি গ্রামে গেলে গ্রেপ্তারকৃত কৃষকদের পরিবারের সদস্য এবং গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকা কৃষক পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ২০১৬ সালে তারা ভাড়ইমারী উত্তরপাড়া ভূমিহীন কৃষকদের নামে বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক পাবনা শাখা থেকে গ্রুপ ঋণ গ্রহণ করেন। যাদের গ্রুপ ঋণের পরিমান ২৫ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। পরবর্তী বছরেই তারা সুদসহ ওই টাকা ব্যাংকের মাঠ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গ্রুপ লিডার (ইউপি সদস্য) বিলকিস বেগমের মাধ্যমে কিস্তি হিসেবে টাকা পরিশোধ করেন। অথচ অনেকেই টাকাই ওই ব্যাংকে পরিশোধ করা হয়নি।

গ্রেপ্তার হওয়া কৃষক রজব আলীর স্ত্রী বুলিয়া খাতুন, আতিয়ারের স্ত্রী রেশমা, মহির উদ্দিনের স্ত্রী বুলিয়া বেগমসহ বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, এই ঋণের টাকা যথা সময়ে পরিশোধ করা হলেও ব্যাংকের অসৎ দুই কর্মকর্তা ও স্থানীয় মহিলা মেম্বার বিলকিস বেগম আত্মসাৎ করেছেন। তাদের দাবী, যারা ঋণ নিয়েছিলেন, তারা যদি ঋণ খেলাপী হবে তাহলে তাদের কোন নোটিশ দেয়া হয়নি। উল্টো ওয়ারেন্ট বের করে রাতের আধারে এসে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা এর ন্যায় বিচার ও দোষীদের শাস্তির দাবী করছি।

অভিযুক্ত মহিলা মেম্বার বিলকিস বেগমের বাড়ীতে গিয়ে তার বাড়ির গেটে তালা ঝুলানো পাওয়া যায়। মুঠোফোনে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে বলেন, এ কাজে সাংবাদিকের প্রয়োজন নেই। আমার সমস্যা আমি নিজেই সমাধান করতে পারবো বলে ফোন কেটে দেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মহির উদ্দিন মন্ডল বলেন, আমি যতটুকু জেনেছি গ্রুপ ঋণের টাকা পরিশোধ না করায় পুলিশ আমার এলাকার ১২ জনকে ধরে নিয়ে গেছে। মহিলা মেম্বারকে বলেছি রোববারের মধ্যে ব্যাংকের জমা করা টাকার হিসেবসহ এলাকায় আসতে। তিনি বলেন, ব্যাংকের যে দুই কর্মকর্তা এই কিস্তির টাকা উঠাতেন তাদের মধ্যেই খাপলা রয়েছে। ইতোমধ্যে একজন মারা গেছে। যে কারণে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ হয়েছে।

বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক পাবনা শাখার ম্যানেজার কাজী জসিম উদ্দিন বলেন, তৎকালীন ম্যানেজার সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদ বাদী হয়ে ২০২১ সালে ব্যাংকের পক্ষে ঋণ ফেরত না দেয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলা দায়েরের পর আদালত তাদের গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করেন। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মামলার বাদী সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদকে একাধিক বার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বর্তমানে তিনি নাটোর শাখায় কর্মরত রয়েছেন। মামলার তারিখে এসে আদালতে হাজিরা দিয়ে যান।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!