‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ পাথর নিক্ষেপে এক দিনেই ভেঙেছে ১৮টি জানালা : কয়েক যাত্রী আহত

পিপ (পাবনা) : রাজশাহী-ঈশ্বরদী-পাবনা হয়ে ঢালারচরগামী নতুন ট্রেন ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ যাত্রীদের জন্য নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিল। সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ট্রেনটি এখন যাত্রীদের কাছে বিভীষিকা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ট্রেনটিতে প্রতিদিনই ঘটছে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। আহত হচ্ছেন যাত্রীরা।

গত বুধবার ছিল ট্রেনযাত্রীদের জন্য ভয়াবহ একটি দিন। কাশিনাথপুর, সাঁথিয়া, রাজাপুর, বাঁধেরহাট, তাঁতীবান্দা এলাকা অতিক্রম করার সময় এদিন দুর্বৃত্তদের ছোড়া পাথরে ট্রেনটির ১৮টি জানালার কাচ ভেঙেছে। এতে পাঁচ-ছয় যাত্রী গুরুতর আহত হন। পাথর নিক্ষেপ ছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই ট্রেনের কামরায় মারামারি, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ফলে আতঙ্ক নিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রী ও রেলওয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা এমন তথ্য দিয়েছেন।

রেলওয়ের একাধিক সূত্র বলছে, কাশিনাথপুর ও বাঁধেরহাটে এলাকাভিত্তিক দ্বন্দের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক দিনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই ‘পাবনা এক্সপ্রেস’ নামে নতুন এই ট্রেন চালু হওয়ার দিন থেকে ট্রেনটিতে উপচেপড়া ভিড় থাকত। প্রতিদিন ৫২৪ আসনের এই ট্রেনে গড়ে ছয় শতাধিক টিকিট বিক্রি হতো। যাত্রীরা আসন না পেয়ে আসনবিহীন টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে এই ট্রেনে চলাচল করেছেন। অথচ পাথর নিক্ষেপ এবং ট্রেনের মধ্যে মারামারি ও সংঘর্ষের কারণে ক্রমেই যাত্রী হারাচ্ছে ট্রেনটি। গত ২৬ জানুয়ারি পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের নাম পরিবর্তন করে ঢালারচর এক্সপ্রেস নামে ট্রেনটি নতুনভাবে উদ্বোধনের পরদিন থেকে প্রায়ই এই ট্রেনে ঘটছে এমন ঘটনা।

যাত্রী, ট্রেনে কর্তব্যরত টিটিই, অ্যাটেনডেন্ট, রেলওয়ে পুলিশ জানায়, গত বুধবার রাত ৮টার সময় ট্রেনটি কাশিনাথপুর ও বাঁধেরহাট এলাকা অতিক্রম করার সময় স্টেশনের আশপাশের এলাকা থেকে বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ট্রেনের চারটি বগির ১৮টি জানালার কাচ ভেঙে যায়। ট্রেনের যাত্রী অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তানিয়ার মাথায় পাথর লেগে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তানিয়া কাশিনাথপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী, সে কাশিনাথপুরের ব্যবসায়ী আমোদ আলীর মেয়ে। তানিয়ার দুলাভাই সাইফুর রহমান বার্তা সংস্থা পিপ‘কে জানান, হঠাৎ চলন্ত ট্রেনের জানালার কাচ ভেদ করে একটি পাথর তানিয়ার কপালে লাগে, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানীয় জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার মাথায় চারটি সেলাই দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এখনও সে পুরোপুরি সুস্থ নয়।
ইলারা জাহান এ্যানিতা, দুর্জয় ইসলাম লিমনসহ কয়েক যাত্রী বার্তা সংস্থা পিপ‘কে জানান, পাথর ছুড়ে মারার ঘটনায় আমরা ভীত ও আতঙ্কিত। নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব।

এদিকে ঢালারচর, কাশিনাথপুর ও বাঁধেরহাট এলাকা থেকে প্রতিদিন স্থানীয় দুর্বৃত্তরা লাঠিসোটা, চাকুসহ ট্রেনে উঠে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ও মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে। চলন্ত ট্রেনের কামরায় স্থানীয় গ্রামবাসী তাদের নিজেদের মধ্যকার বিভেদ নিয়ে মারামারিতে লিপ্ত হওয়ায় ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে আসন ছেড়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করেন। এ সময় ট্রেনে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ট্রেনে কর্তব্যরত রেলওয়ে পুলিশ সদস্য আকবর আলী বার্তা সংস্থা পিপ‘কে জানান, প্রতিদিন এই ট্রেনে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আতঙ্কে ট্রেনে ডিউটি করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্তব্যরত রেলওয়ের কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রতিদিন মারামারি ও পাথরের ভয়ে এই ট্রেনে ডিউটি নিতেও অনীহা প্রকাশ করেন টিটিই, অ্যাটেনডেন্টসহ অন্য কর্মচারীরা।

পাবনা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাব্বির হোসেন বার্তা সংস্থা পিপ‘কে জানান, এই ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিটিও) নাসির হোসেন বলেন, কীভাবে এই সংকট দূর করা যায়, তা নিয়ে আমরাও ভাবছি। জনসচেতনতা বাড়াতে ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগও নিয়েছি।

পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) আসাদুল হক বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, একদিনে ১৮টি গ্লাস পাথর ছুড়ে ভাঙার ঘটনাটি উদ্বেগজনক। আমরা পাবনার পুলিশ সুপার, বিভাগীয় রেলওয়ে পাকশীর পুলিশ সুপার এবং কাশিনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে জনসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া প্রতিদিন ট্রেন চলাচলের আগে-পরে মোটর ট্রলিতে করে ওই এলাকায় রেললাইন পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *