তথ্য-প্রযুক্তি খাতে সরকারি জনবল প্রসঙ্গ—–ড. মো. সোহেল রহমান

আমাদের দেশ তথ্য-প্রযুক্তি খাতে অনেক দ্রুত এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। আসলে আমরা বিশ্বেই তথ্য-প্রযুক্তির এক বৈপ্লবিক সময় পার করছি। আর অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে আমাদের দেশের গত প্রায় এক দশকের জাতীয় নীতিমালায় একে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, যেভাবে এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবের কারণে তার সর্বোচ্চ সুফল আমরা পাইনি। আমাদের হিসাব করা দরকার, কতটুকু পাওয়ার কথা ছিল আর কতটুকু আমরা অর্জন করতে পেরেছি। যেহেতু এসংক্রান্ত সব তথ্য-উপাত্ত আমার হাতে নেই, সেহেতু সেই হিসাব সরাসরি করা আমার মতো একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে সমন্বয়ের অভাব আমাদের চোখে পড়েছে, যা তথ্য-প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যেক খারাপভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে বর্তমানে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এবং দক্ষতার সঙ্গে সরকারি সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সরকারি অধিদপ্তরের সবগুলোতেই আইটি সেটআপ থাকা অত্যাবশ্যক। এ বিষয়ে আসলে কারো দ্বিমত আছে বলে আমার মনে হয়নি। তবে এর গুরুত্ব আমরা সবাই ঠিকমতো অনুধাবন করতে পেরেছি কি না সেটি একটি প্রশ্ন বটে! অনেকে মনে করেন যে কম্পিউটার বা আইটি বিষয়ের জনবলের কাজ কম্পিউটার সামগ্রী কেনা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর সে কারণে কম্পিউটার ও আইটি-সংক্রান্ত জনবলকে অবমূল্যায়ন করার বিষয়টি এবং তাদের প্রতি সরকারি অফিসের, বিশেষত অ্যাডমিন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের উপেক্ষার মনোভাব সম্পর্কে কমবেশি সবাই আমরা অবহিত। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে কম্পিউটার সংক্রান্ত জনবলের কাজ শুধু কম্পিউটার সামগ্রী কেনা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্তে বিশেষত কৌশলগত বিষয়ে কম্পিউটার জনবলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এর কারণ হলো, বর্তমান যুগে এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাগুলো তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে নেওয়া এবং তা প্রযুক্তিবান্ধব হওয়া দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। আর তাই সব সরকারি অফিসেই কম্পিউটার ও আইটি খাতের জন্য দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল থাকা অত্যাবশ্যক। যার নেতৃত্বে থাকতে হবে কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘কম্পিউটার কর্মচারী (সরকারি প্রতিষ্ঠান) নিয়োগ বিধিমালা ২০১৮’-র একটি নির্মোহ নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সরকার বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার কর্মচারী নিয়োগের উপর্যুক্ত বিধিমালা পরীক্ষণের উদ্যোগ নেয়। অতি সম্প্রতি সরকারের বদান্যে সরকারি চাকরির বেতন-ভাতাদি প্রায় দুই গুণ হয়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরিগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। আর তাই এ উদ্যোগ সময়োপযোগীও বটে। কিন্তু আমরা অবাক হই এটা জানতে পেরে যে যেই উপকমিটিকে এই পরীক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাতে কম্পিউটারবিজ্ঞান বিষয়ের কোনো বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়নি! আর তাই বোধ করি অনেক বিষয়েই অসংগতি আমাদের চোখে পড়ে।
প্রথমে বলে নেওয়া ভালো যে কম্পিউটারের কর্মকর্তার পদগুলো মূলত দুটি আলাদা ধারায় নিয়োগ হয়ে থাকে আর তাঁদের কাজের ও দায়িত্বের ধারাও কিছুটা আলাদা। এর মধ্যে একটি হলো রক্ষণাবেক্ষণের ধারা, যেখানে প্রথম কর্মকর্তা (গ্রেড-৯) পদটি হলো সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এবং অন্যটি হলো প্রগ্রামিংয়ের ধারা যেখানে প্রথম কর্মকর্তা (গ্রেড-৯) পদটি হলো সহকারী প্রগ্রামার। এই দুই পদেই সরাসরি নিয়োগের যোগ্যতার ক্ষেত্রে বলা আছে, যেকোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স বা কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বা ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বা পদার্থবিজ্ঞান বা ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বা গণিত অথবা ফলিত গণিত বা পরিসংখ্যান অথবা ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস টেকনোলজি সংশ্লিষ্ট নূন্যতম চার বছর মেয়াদি স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো এ দুই পদে আমরা এখনো কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ছাড়া অন্য বিষয়গুলোকে যোগ্যতার মধ্যে রাখছি কেন? আমরা জানি যে একসময় আমাদের দেশে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত মানুষের অভাব ছিল। কিন্তু আজকে কি সেই অবস্থায় আমরা রয়েছি? মোটেই না। সত্যি কথা বলতে কী, দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কি পাবলিক কি প্রাইভেটÑকম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগটি রয়েছে এবং কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই বিষয়টিতেই ছাত্রসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বস্তুত আমরা যদি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ছাত্রসংখ্যা যোগ করি, তাহলে তা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠিত যেকোনো কারিগরি ও প্রকৌশল বিষয়ের থেকে বেশি হবে। তার মানে হলো, আমরা এখন পর্যাপ্তসংখ্যক কম্পিউটারবিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী তৈরি করছি (অনেকে হয়তো ডিগ্রির গুণগত মানের কথা তুলবেন; কিন্তু সেটি তো অন্য বিষয়ের জন্যও একইভাবে প্রযোজ্য)। তাহলে কেন কম্পিউটার প্রগ্রামার পদে কিংবা সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী পদে পদার্থবিজ্ঞান বা ফলিত পদার্থবিজ্ঞান অথবা গণিত বা ফলিত গণিত অথবা পরিসংখ্যানে স্নাতকধারীদের আমরা ডেকে আনছি? এমনকি সহকারী প্রগ্রামার পদে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতকদের ডেকে আনাও মোটেই সঠিক নয়। তবে সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী পদে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকদের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের স্নাতকরা। সুতরাং অতি সত্বর আমাদের এ বিষয়ে সংশোধন আনা দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটিকে বসাতে না পারলে আমাদের সঠিক কাজটি সঠিক সময়ে হবে না। আর কম্পিউটারবিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি এমন একটি বিষয় যে এটাকে যেনতেনভাবে নেওয়া মোটেই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
দেখা যাচ্ছে যে সহকারী প্রগ্রামার পদটিতে সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে ৬০ শতাংশ পদের জন্য। বলা হয়েছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিসহ ডাটা এন্ট্রি বা কন্ট্রোল সুপারভাইজার পদে (গ্রেড-১০) নূন্যতম পাঁচ বছর অথবা সিনিয়র ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোল অপারেটর (গ্রেড-১৩) পদে নূন্যতম সাত বছর অথবা কম্পিউটার অপারেটর পদে (গ্রেড-১৩) নূন্যতম সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এখন ভয়ংকর ব্যাপারটি লক্ষ করুন ডাটা এন্ট্রি বা কন্ট্রোল সুপারভাইজার পদ (গ্রেড-১০) এবং কম্পিউটার অপারেটর পদ (গ্রেড-১৩) এ দুই পদেই শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে বলা আছে যে বিজ্ঞানে স্নাতক হতে হবে। এর সঙ্গে প্রথম পদটির যোগ্যতায় অভিজ্ঞতার কথা আছে, আর দুই পদেই অঢ়ঃরঃরফব ঞবংঃ-এ উত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর সিনিয়র ডাটা এন্ট্রি কন্ট্রোল অপারেটর (গ্রেড-১৩) পদে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে যেকোনো বিষয়ে স্নাতক হলেই চলবে বলা হয়েছে। এর মানে হলো, কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের স্নাতক ডিগ্রি তো পরের কথা, এমনকি বিজ্ঞানেও স্নাতক ডিগ্রি নেই এমন একজনের পক্ষেও সহকারী প্রগ্রামার হয়ে যাওয়া সম্ভব। আর সেই সূত্র ধরে ক্রমাগত পদোন্নতির মাধ্যমে তাঁর পক্ষে কম্পিউটার জনবলের সর্বোচ্চ পদ অর্থাৎ পরিচালক বা মহাব্যবস্থাপক (গ্রেড-২) পর্যন্তও চলে যাওয়া অসম্ভব নয়। এটা কি কাম্য হতে পারে?
আমার বিন¤্র বিবেচনায় সহকারী প্রগ্রামার ও সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এই দুই পদেই (অর্থাৎ কর্মকর্তা পর্যায়ের শুরুর পদ) কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল কিংবা সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি ছাড়া কোনোভাবেই নিয়োগ বা পদোন্নতি হওয়া ঠিক নয়। যদি আমরা সরাসরি নিয়োগের পাশাপাশি নিম্নতর পদ থেকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু (এ ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ খুব বেশি মনে হয়) পদোন্নতির সুযোগ রাখতে চাই, তাহলেও তাদের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে হবে এবং এ ব্যাপারে সরকার তাদের বিশেষ সুবিধা (যেমন ছুটি, বৃত্তি ইত্যাদি) দিতে পারে। এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা না বললেই নয়; খুব আশ্চর্যজনকভাবে আমরা লক্ষ করি যে এই পদোন্নতির সুযোগটি কম্পিউটার প্রগ্রামার পদের জন্য রাখা হলেও সহকারী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী পদের জন্য রাখা হয়নি। এ বিষয়টি এক রহস্য হয়েই রইল।
আমরা আশা করতে পারি যে সরকার এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর তা করার সবচেয়ে প্রথম ধাপ হলো সংশ্লিষ্ট কমিটিতে একাধিক কম্পিউটার বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা কিংবা তাঁদের পরামর্শ নেওয়া।

লেখক : অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বুয়েট

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *