তাড়াশে ফসলি জমিতে পুকুর খননের হিরিক প্রশাসন নিরব

তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের তাড়াশে গণহারে চলছে পুকুর খনন, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, দেখার কেউ নেই। মিটলে জলাশয়, আর না মিটলে ধরাশাই। অর্থ্যাৎ চুক্তিতে মিটলেই ফসলি জমি কেটে পুকুর খনন করা যায়। এমন অভিযোগ উঠেছে তাড়াশ উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
সরকারি আইন যেন কেউই মানছেনা তাড়াশে ফসলি জমি কেটে পুকুর খননের হিড়িক পরেছে,ফলে কমে যাচ্ছে ফসলি জমি,সেই সঙ্গে যেখানে-সেখানে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন করায় ফসলের মাঠে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে,এতে ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন।এদিকে পুকুর খননের কাদামাটি আঞ্চলিক ও মহাসড়কের ওপর দিয়ে বহন করায় সড়কগুলো কাদায় পরিণত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ।
গত কয়েক বছর যাবত ফসলী জমিতে পকুুর কাটার ফলে উপজেলার মাধবপুর, শ্রীকৃষ্টপুর,বোয়ালিয়া,মঙ্গলবাড়িয়া সহ নিচু এলাকার হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি জলাবদ্ধতা হয়ে পড়ছে। খাল, ব্রীজ ও পানি নিস্কাশনের পথ বন্ধ করে ফেলায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। পুকুর খনন করায় ফসলি জমির মাঠ হতে বর্ষার পানি সময় মতো নামতে না পারায় রবিশস্য চাষ করতে পারেনি কৃষকেরা ।্ ওই সব এলাকার হাজারো কৃষকেরা পুকুর খনন বন্ধে সমাবেশ করেছে। বিলম্বিত হচ্ছে ইরি-বোরো ধান আবাদও।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, ২০১২ ইং সাল থেকে ২০২০ ইং সাল পর্যন্ত তাড়াশ উপজেলায় ৭৫০টি পুকুর খনন করা হয়। এ পুকুর খননের ফলে ৫২০ হেক্টর আবাদী জমি কমে যায়। চলতি বছরেও এ উপজেলায় শতাধিক পুকুর খনন চলমান । গত দশ বছরে তাড়াশ উপজেলায় ভূমি নীতিমালা উপেক্ষা করে আড়াই হাজারের বেশি পুকুর খনন হয়েছে। বিশেষ করে তাড়াশ সদর নওগাঁ, মাধাইনগর, বারুহাস ও মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নে বেশি পুকুর খনন হয়েছে।
এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা উপজেলা প্রশাসনের চাপের মুখে পুকুর কাটা সাময়িক বন্ধ রেখে ছিল। আবার ও মহা ধুমধামের সাথে ফসলি জমিতে শুরু করেছে পুকুর খনন। প্রশাসনের তৎপরতা শিথিল হওয়ার কারণেই এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কতিপয় কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে পুকুর খননে এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল। তাড়াশ উপজেলার সর্বত্রই এখন দিন-রাত অবাদে কৃষি আবাদযোগ্য ফসলি জমি কেটে পুকুর করা হচ্ছে।
জানা গেছে,এলাকার কিছু অসাধূ ব্যবসায়ী কৃষকদের অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে তাদের আবাদি জমি বাৎসরিক লীজ নিয়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে। যেখানে কৃষকেরা ধান চাষে প্রতি বিঘা জমিতে বছরে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকার লাভ করে থাকে,সেখানে পুকুর কাটলে প্রতি বিঘায় বছরের ১৫-২০ হাজার টাকা পায়। তাই অধিক মুনাফার লোভে কৃষকরা অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জমি লিজ দিয়ে পুকুর খনন করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে দিন-রাত পুকুর খনন করছে উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের সগুনা গ্রামের আলহাজ্ব আব্দুল গনি ও মোহাম্মদ আলী মিলে সগুনা বাজারের পশ্চিমে ও পূর্বে সরকারি খাল দখল করে প্রায় ৫ বিঘা আয়তনের পুকুর কাটছে। এছাড়া একই ইউনিয়নের লালুয়ামাঝিড়া, কামারশোন, মাধাইনগর ইউনিয়নের সেরাজপুর, মাধাইনগড়, ও গুড়মা, পৌর এলাকার কোহিত, কাউরাইল, উলিপুর জাহাঙ্গীরগাতী, পঞ্চিম ওয়াবদারবাধঁ, বাশবাড়িয়া, বারুহাস ইউনিয়নে চৌবাড়িয়া, বিনসাড়া, বস্তুল ,পওতা মনোহরপুর ,তালম ইউনিয়নে চৌড়া, পাড়িল, নওগাঁ ইউনিয়নে সাকুয়াদীঘি, মালিপাড়া মাগুড়া ইউনিয়নের দবিলা ,হামকুড়িয়া,ঘড়গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে অবাধে চলছে পুকুর খনন সব মিলে বর্তমানে শতাধিক পুকুর খননের কাজ চলমান রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সচেতন মহলের সাথে কথা বলে জানা যায় উপজেলার পুকুর খননকারী চক্রের মূলহোতা কোহিত গ্রামের মোহাম্মদ আলী, তাড়াশ গ্রামের রহুল আমিন, বিনসাড়া গ্রামের মনিরুল ইসলাম ,ভায়াট গ্রামের আলআমিন, ভাদাশ গ্রামের আলম, আড়ঙ্গাইল গ্রামের জানমাহমুদ, শোলাপাড়া গ্রামের আসাদ, বোয়ালিয়া গ্রামের সোবাহান, কাউরাইলের আব্দুস সাত্তার, হামকুড়িয়া গ্রামের স্বপন, পেঙ্গুয়ারী গ্রামের সাইফুল ও রাজু তারাই মুলত প্রশাসন, পুলিশ ও কতিপয় সাংবাদিকদের সাথে অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করে পুকুর খনন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভেকুর ঠিকাদার বলেন, সাংবাদিকরা বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিবে। আর আমরা ভুমি অফিস সহ বিভিন্ন দপ্তরে টাকা দেই। তাই পুকুর খননে কোন সমস্যা হয় নেই।
পুকুর খননের ফলে খাল দখল করে পুকুরের পাড় করায় পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হওয়ায় জলাবদ্ধতার কারণে এ বছর প্রায় ১হাজার হেক্টর জমিতে শরিষার আবাদ কম হয়েছে। সরিষার আবাদ কম হওয়ায় কোটি টাকার মধূ আহরণও সম্ভব হয়নি। অথচ গত বছর এ উপজেলায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে ,বাড়তি ফসল হিসেবে আট হাজার সাত শ মেট্রিক টন সরিষা পেয়েছিল কৃষক। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা।
সম্প্রতি উপজেলার তালম ইউনিয়নের লাউতা গ্রামের স্কুল শিক্ষক আব্দুর রশিদ, কাজিপুর গ্রামের দুদু হাজী, বৃ-পাচান গ্রামের সুমন হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, এরা আমার কাছে টাকা দাবি করেছিল, না দেয়ায় আমার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। অথচ প্রতিদিন কি করে অসংখ্য পুকুর প্রকাশ্যে খনন করছে, তা উপজেলা প্রশাসনই বলতে পারবে।
পুকুর খননকারী বেশ বিশকিছু ঠিকাদারের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রায় প্রতিটি পুকুর হতে ১০হাজার হতে ৩০হাজার টাকা আদায় করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের অফিস সহায়ক মো: রহুল আমিন।
টাকা নেওয়া বিষয়ে (ভূমি) অফিসের অফিস সহায়ক মো: রহুল আমিন টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন আমার উপর মিথ্যাচার করা হচ্ছে।আমি পুকুরের বিষয়ে কিছু জানিনা।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ লুৎফুন্নাহার লুনা বলেন, ‘জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না’ সরকারি নির্দেশ অমান্য করে তিন ফসলি কৃষি জমিগুলোকে পরিণত করা হচ্ছে গভীর পুকুরে। এতে করে উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষি জমির পরিমাণ।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মেজবাউল করিমে সাথে মোবাইল ফোনে বার বার চেষ্টা করলে তিনি ফোন ধরেননি ।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) চৌধুরী মোঃ গোলাম রাব্বী বলেন ডিসি স্যারের অনুমতি ছাড়া কোন বক্তব্য দিতে পারবনা।
লুৎফর রহমান
তাড়াশ সিরাজগঞ্জ
তারিখ৩০ -০১-২০২১ইং

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *