দশ কোটি টাকার বই কেনার জন্য পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে পাবিপ্রবি ভিসির নতুন গ্যাড়াকল !

পিপ (পাবনা) : দেড় দশকের অভিজ্ঞতা, একক কার্যাদেশে ১০ কোটি টাকার বই সরবরাহ করার যোগ্যতা এবং বছরে ১২ কোটি টাকার বই বিক্রির (টার্নওভার) প্রমাণ থাকা এমন সব কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়ে বিদেশি বই কিনতে চায় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব শর্তের আড়ালে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টা দেখতে পাচ্ছেন দেশের বড় প্রকাশক, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীরা। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১০ কোটি টাকার বই ও জার্নাল কিনতে এমন দরপত্র আহ্বান করেছে। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩১ আগস্ট। শর্তগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এমন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্য কেউ দরপত্রে অংশ নিতে না পারেন। পুস্তক প্রকাশনা, বিক্রেতা ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের সংগঠনে শত শত সদস্যের মধ্যে এমন কেউ নেই, যাঁর পক্ষে এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, এই অভিযোগ পাওয়ার কথা তিনি মনে করতে পারছেন না। তবে তাঁর মতে, সরকারের ক্রয়নীতি (পিপিআর) অনুযায়ী দরপত্র বিষয়ে অভিযোগ করার নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া আছে। প্রকাশক ও বিক্রেতাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে দরপত্রে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়াভাবে বিদেশ থেকে বই আমদানি ও সরবরাহ করছে। দরপত্রের শর্ত ঠিক হচ্ছে ওই প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা এবং অন্যদের সীমাবদ্ধতার বিষয় মাথায় রেখে।

জানতে চাইলে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জি এম আজিজুর রহমান বলেন, তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে চান না। কথা বলার অনুমতিও তাঁর নেই। দরপত্রের বিজ্ঞাপনে তাঁর সই রয়েছে। এসব শর্ত জুড়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি ধন্যবাদ দিয়ে কথা শেষ করেন। কে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারবেন, তা-ও বলতে চাননি তিনি।
এরপর প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম রোস্তম আলীর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, এখন বাইরে আছেন, কথা বলতে পারবেন না। তাহলে কখন কথা বলবেন জানতে চাইলে উপাচার্য জানান, এখন বা পওে কখনোই তিনি কথা বলতে চান না।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগকে অনুরোধ করা হয় এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দেওয়ার জন্য। জনসংযোগ কর্মকর্তা সময় নিয়ে জানান, দরপত্রের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তিনি পাননি।

এরপর যোগাযোগ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম রোস্তম আলীর সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, এখন বাইরে আছেন, কথা বলতে পারবেন না। তাহলে কখন কথা বলবেন জানতে চাইলে উপাচার্য জানান, এখন বা পরে কখনোই তিনি কথা বলতে চান না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ১০ কোটি টাকার বই রাখার জায়গাও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। তিনতলা একটি ভবনের নিচতলায় গ্রন্থাগারে প্রায় দুই কোটি টাকার বই রাখা হয়েছে। স্থানাভাবে সব বই সাজিয়ে রাখা যায়নি সেখানে। ভবনের দ্বিতীয় তলায় ক্লাস হয়, তৃতীয় তলায় শিক্ষকদের কক্ষ রয়েছে। গ্রন্থাগারের জন্য তিনতলা ভবন সম্প্রসারণের চিন্তা করা হলেও তার অনুমোদন হয়নি। এর মধ্যে ১০ কোটি টাকার বিপুল বই এনে কোথায় রাখা হবে, সে প্রশ্ন শিক্ষক–কর্মকর্তাদেরও।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির রাজধানী শাখার সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, দরপত্রের শর্তগুলো অবাস্তব। এসব শর্ত প্রত্যাহার করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে এই অসৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করা হবে। বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি ওসমান গণি বলেন, ‘করোনাকালে দেশে বই ব্যবসার আকাল চলছে। আমরা চাই অধিকসংখ্যক প্রকাশক দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাক। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে বই অবশ্যই কিনতে হবে। কেবল বিদেশি বই কেনার নামে এসব বিষয় উপেক্ষা করা যাবে না।’

করোনাকালে দেশে বই ব্যবসার আকাল চলছে। আমরা চাই অধিকসংখ্যক প্রকাশক দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাক। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে বই অবশ্যই কিনতে হবে। কেবল বিদেশি বই কেনার নামে এসব বিষয় উপেক্ষা করা যাবে না।’

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি ওসমান গণি এই দরপত্র অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের শর্ত কার স্বার্থে এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *