দেশের উন্নয়ন ও শান্তিতে গবেষণার বিকল্প নেই: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের উন্নয়নে, দেশের শান্তিতে গবেষণার বিকল্প নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গবেষণা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে আমাদের তরুণদের। সবকিছুতেই সফলতা পেতে হলে অতীত জানার প্রয়োজন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, তা সবারই জানা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন গৌরব অতীত আমাদের চলার পথের অনুপ্রেরণা। এসব জানতে হলে গবেষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ এবং বিশেষ গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিতে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, এখন পরিবর্তনশীল যুগ। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের আরও এগিয়ে চলতে হবে। আমি জানি বাংলাদেশের মানুষ অনেক মেধাবী। তারা চাইলে সব পারে। আর আমাদের বর্তমান প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা অর্জন করে বিশ্বকে টেক্কা দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সমৃদ্ধির দেশ গরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। প্রথম দফায় ক্ষমতায় আসার পর দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার দুরাবস্থার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ওই সময় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিই কারও মাথায়ই ঢোকেনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি প্রথমবার সরকারে এসেই লক্ষ করলাম- আমাদের দেশে গবেষণার জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হত না। গবেষণার জন্য কোনো বিশেষ সহযোগিতা ছিল না বা গবেষণাকে কোন গুরুত্বই দেওয়া হত না। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সচরাচর নিয়মিত শিক্ষার ক্ষেত্রে যতটুকু গবেষণা করা- সেটুকুই করত। এর জন্য যে বিশেষভাবে প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন এবং গবেষণার জন্য যে আলাদা একটা বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন, সুযোগটা সৃষ্টি করে দেওয়া প্রয়োজন- এই কথাটাই তাদের মাথায় কখনও ঢোকে নাই। তিনি বলেন, আমি প্রথমেই একটা থোক বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট করে দিলাম। কারণ যখন সরকার গঠন করেছিলাম তখন এশিয়ায় অর্থনৈতিক মন্দাও ছিল। তারপরও আমাদের সেই সীমিত সম্পদ দিয়েৃআমাদের রিজার্ভ মানিও কম ছিল, মাথাপিছু আয় কম ছিল। তারপরও আমার মনে আছে, প্রথমে আমি ১২ কোটি টাকা শুধু গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখলাম। পরের বছর যখন বাজেট করলাম তখন ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ আমরা গবেষণা এবং তথ্যপ্রযুক্তির জন্য আলাদাভাবে রেখে দিলাম। তখন থেকে যে আমরা গবেষণা শুরু করলাম, তার ফলে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা গবেষণায়য় গুরুত্ব দিয়েছিলাম বলেই আজকে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা উৎকর্ষ লাভ করতে পেরেছি। বিজ্ঞান ও তথপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের সোনার বাংলা। তাই গবেষণাটা উন্নয়নের মুখ্য বিষয়। গবেষণার জন্য সরকারের নেওয়া আরও নানা উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বলেন, আজ বাংলাদেশে আপনারা একটু লক্ষ্য করবেন পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই এই ২১ বছর আর ২০০১ থেকে ২০০৮ এই ২৯ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কোনো চিহ্ন তারা রাখতে পারেনি বা করেনি। আর করবে না এটা স্বাভাবিক। যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি আর যারা গণহত্যার সাথে জড়িত আর যারা এখনও অগ্নিসন্ত্রাস করে মানুষ হত্যা করে, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসকে যারা লালন-পালন করে তারা দেশের উন্নতি চায় না। কারণ স্বাধীনতার আদর্শেই যদি কেউ বিশ্বাস না করে তারা দেশের মানুষের উন্নতি চাইবে কেন? ক্ষমতায় এলেই নিজের পকেট ভরতে ব্যস্ত হয়ে যায় বিএনপি। আর আজ দেশ দ্রুত ক্রমবর্ধমান উন্নয়নশীল। আজকে আমরা বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি। বিশ্বাস করি আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। এই পথ ধরেই বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। এই পথ চলার মধ্যে দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবো। আমরা এখানে থেমে থাকিনি। প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। সেইসঙ্গে আমরা দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ২০১০ সালে এসে ২০২১, পরবর্তীতে ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা আমরা প্রণয়ন করেছি। তারপরও আমরা ২১০০ সালের বাংলাদেশ কেমন হবে, সেটা মাথায় রেখে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রণয়ণ করেছি। জনগণ যেনো উন্নত জীবন পায়, সুন্দর জীবন পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে আমরা এই দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছি। আমরা তো ততোদিন বাঁচবো না, কিন্তু শতবর্ষ পরে যারা আসবে, তাদের কথা মাথায় রেখে আমাদের এই পরিকল্পনা। বাংলাদেশের উন্নয়নে গবেষকদের আরও ভালো করে কাজ করার আহ্বান শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। অর্থনৈতিকভাবে এখন আমরা স্বাবলম্বীতা অর্জন করছি। আমি মনে করি এখানে যারা গবেষক আছেন আরও ভালো করে গবেষণা করুন, কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও বেশি উৎকর্ষ লাভ করতে পারে এবং কোথায় কোথায় আমাদের আরও বিনিয়োগ করা দরকার। শেখ হাসিনা আরও বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যাতে ব্যবহার হয়, সেক্ষেত্রে আমি গুরুত্ব দেয়েছি। এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। সকলের হাতে স্মার্টফোন। মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছি। মহাকাশ জয় করেছি। আরও অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটালে এগিয়ে নিচ্ছি দেশে। এ ছাড়া আমাদের মহাকাশেও গবেষণা প্রয়োজন। হয়তো আমরা মহাকাশেও যেতে পারবো। সবকিছু থেকে বের হবার একমাত্র পথই গবেষণা। এ লক্ষ্যেই আমরা এই বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ চালু করেছি। এসময় প্রধানমন্ত্রী যারা গবেষণা করে অবদান রেখেছেন, যারা অনুদান পাচ্ছেন, তাদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, এখানে যারা গবেষক আছেন, আরও ভালো করে গবেষণা করুন। যেকোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও বেশি উৎকর্ষ সাধণ করতে পারে। কোথায় কোথায় আমাদের আরও বেশি বিনিয়োগ করা দরকার, গবেষণা করে বের করতে হবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই কাজ করুন আপনারা। এ ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নে গবেষক বিজ্ঞানীদের অনেক অবদান আছে। আপনারা আরও মনোযোগের সঙ্গে কাজ করবেন। পরে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা যখন একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ সবকিছু মোকাবিলা করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন আমার পুরো পরিবারকে আমি হারাই। এসব আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানা দরকার। বোঝা দরকার জাতির পিতা দেশের জন্য কী কী করে গেছেন। আমাদের যে স্বাধীনতার চেতনা-গৌরব, সে বিষয়েও গবেষণার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন পাকিস্তানি শাসকরা। ১৯৪৮ থেকে জাতির পিতা আন্দোলন করে গেছেন বাঙালির ভাষার জন্য। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানিদের অত্যাচারের জবাব দিয়ে গেছেন। বাঙালির মুক্তির সনদ তিনি রচনা করেছিলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দিয়ে। আজ ১০ এপ্রিল (গতকাল বুধবার)। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল এ সরকার গঠিত হয়। পরে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামে এই মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের নামকরণ হয় মুজিবনগর, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ, এনএসটি ফেলোশিপ এবং বিশেষ গবেষণা অনুদান প্রাপ্তদের হাতে চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ ফ ম রুহুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *