পরস্ত্রীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে ইসলাম কী বলে?

ধর্মপাতা: ইসলাম এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। একটি পরিপূর্ণ মানবিক কল্যাণ ধর্মের নাম হচ্ছে ইসলাম। প্রতিটি মানুষ তার পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখ-শান্তিতে বসবাস করবে, এর মূল নিয়ামক হচ্ছে স্বামী এবং স্ত্রীর দাম্পত্য জীবন। বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে যাদের যাত্রা শুরু হয়।
কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক অশান্তি বেড়েই চলেছে আর ভেঙে যাচ্ছে সুখের সংসার। কারণ বিবাহিত কোনো নারী বা পুরুষ নিজ নিজ স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ধরণের সর্ম্পক কিংবা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে।
ধর্ম ও সমাজ বিবর্জিত এসব গর্হিত কাজকে ইসলাম কোনভাবেই সমর্থন করে না। বরং বিবাহ বহির্ভূত এসব কাজকে ইসলামে গর্হিত অপরাধ বলে চিহিৃত করা হয়েছে।
আমরা দেখতে পাই বর্তমানে অনেক পরিবারই ধ্বংস হচ্ছে কেবল পরস্ত্রীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ তথা পরকীয়ার জেরে। বিবাহবহির্ভূত এমন অবৈধ সম্পর্কের কারণে সংসারে অশান্তি-ভাঙন এমনকি জঘন্য হত্যাকা-ও সংঘটিত হচ্ছে। তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই এ বিষয়ে অনেক সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
বিবাহবহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে ইসলামি শিক্ষার ওপর আমল করার বিকল্প নেই। হাদিসে পাকে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কোনো (বেগানা) নারীর সঙ্গে নির্জনে না বসে। কেননা (সে সময় কুমন্ত্রণা দিতে) শয়তান তাদের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে যায়।’ (তিরমিজি)
সাহাবায়ে কেরাম বলেন, ‘আল্লাহর নবি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিষেধ করেছেন যে, আমরা যেন নারীদের কাছে তাদের স্বামীদের অনুমতি ছাড়া গমন না করি।’ (তিরমিজি)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনুল কারিমের একাধিক আয়াতে নারীদের উদ্দেশ্যে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মর্মে ঘোষণা করার নির্দেশ দেন-
– ‘(হে রাসুল!) আপনি ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। সাধারণত প্রকাশমান ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকের ওপরে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, বাবা, শ্বশুর, ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, স্ত্রীলোক অধিকারভূক্ত বাদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও (এমন) বালক- যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতিত অন্য কারো সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। (এমনকি) তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর; যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা নুর : আয়াত ৩১)
-‘হে নবি পতœগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না। যার ফলে সে ব্যক্তির কুবাসনা সৃষ্টি হয়, যার অন্তরে আসক্তি আছে। তোমরা উত্তম (সংযত) কথাবার্তা বল।’ (সুরা আহজাব : আয়াত ৩২)
আবার পুরুষদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
‘(হে রাসুল! আপনি) মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তাআলা সে ব্যাপারে খবর রাখেন।’ (সুরা নুর : আয়াত ৩০)
হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
– ‘তোমরা সেই নারীদের কাছে গমন করো না যাদের স্বামীরা বাইরে (বিদেশে) আছে। কারণ, শয়তান তোমাদের রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়।’ (তিরমিজি)
– হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মাহরাম ছাড়া কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না এবং কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফরও করবে না। এক সাহাবি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার স্ত্রী হজ করতে যাচ্ছে আর আমি অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজে যাও।’ (বুখারি ও মুসলিম)
স্বামীর জন্য স্ত্রী আর স্ত্রীর জন্য স্বামী হলো দুনিয়ার দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তারা উভয়ে সুন্দর, সুখের নীড় এবং সভ্যতা নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। পারিবারিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত ও ভালোবাসাপূর্ণ।
কেননা পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা ও বিশ্বাস পারিবারিক বন্ধনকে অটুট রাখে। আর পারস্পারিক অনাস্থা, সন্দেহ-সংশয়, অবিশ্বাস, আনুগত্যহীনতা এবং সর্বোপরি অবাধ স্বাধীনতাই পরিবার ব্যবস্থা ধ্বংস করে। এ কারণেই রাসুলে আরাবি ঘোষণা দেন-
হজরত সাহল ইবনে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিনদার হবে আমি তার বেহেশতের জামিনদার হব।’ (বুখারি)
সন্তানকে সুন্দর করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আর সন্তান যদি পারিবারিক অশান্তির মধ্যে বড় হয়, এটি তার মনের ওপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। এ প্রভাব পড়ে তার পরবর্তী জীবনেও।
তাই শিশুদের বিকাশের জন্য সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ জরুরি। কিন্তু সাময়িক আনন্দের জন্য অনেকে এমনও আছেন যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভুলে গিয়ে নিজ সন্তান, স্বামী এবং আপনজনকেও হত্যা করে বসে। মানুষ আজ এতটাই অবক্ষয়ের শিকার যে কতকের কর্মকা- দেখে লজ্জায় পড়তে হয়।
তাই আসুন, সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এমন কিছু না করি- যা সাময়িক আনন্দের জন্য একটি পরিবারকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে আমরা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই; তাহলে আমাদের সবাইকে অবশ্যই অবৈধ সম্পর্ক পরিত্যাগ করতেই হবে।
সুতরাং নারী-পুরুষ সবার জন্য জরুরি যে, আমরা যেন এমন কোনো গর্হিত কাজ করে না বসি; যার ফলে আল্লাহ আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *