পাবনার রুহুল বিলে বাউত উৎসবে মেতেছে মাছ শিকারিরা

পিপ (পাবনা) : গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাউত উৎসবের কথা আমাদের সকলের জানা। বর্ষার শেষে বিল অঞ্চলে পানি কমার পরে স্থানীয় সৌখিন মাছ শিকারীরা দিন করে বিলে নামে মাছ ধরার জন্য। দিনের প্রথম প্রহরে সূর্য উঠার আগে প্রস্তুতি গ্রহণ করে তারা। বিল পারের কয়েক হাজার মানুষ যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে মাছ শিকারের জন্য বিলে জ¦লে নেমে পরে।

পাবনা ভাঙ্গুড়া উপজেলার চলন বিলের শেষ অংশে রাহুর বিলে মঙ্গলবার ছিলো বাউথ উৎসব। এই বাউত উৎসবকে ঘিরে চলে নানা আয়োজন। ভোর থেকে মাছ শিকার শুরু করে চলে দুপুর পর্যন্ত। উন্মুক্ত বিলে যার যেমন খুশি তাই দিয়ে শিকার করে দেশী বিভিন্ন প্রকারের মাছ।

জেলার দিক্ষিন পাশে অবস্থিত তিনটি উপজেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা। এই উপজেলার বেশ কিছু অংশ চলন বিলের মধ্যে পরেছে। তাই প্রতি বছর এই উপজেলা গুলোতে পর্যায় ক্রমে বিলের বিভিন্ন অংশে বাউত উৎসবের আয়োজন করে থাকে স্থানীয়রা। বিস্তৃন বিলের সল্প জ¦লে দেশী মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার হয়ে থাকে এই মাছ শিকারে। শীতের হিমেল হাওয়া আর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে বছরের এই সময়ে বিশেষ করে অগ্রহায় মাসের শেষ দিকে আর পৌষ মাসের প্রথমে বিলে এই বাউত উৎসব হয়ে থাকে। বাউত উৎসবকে ঘিড়ে বিল পারের মানুষদের মধ্যে চলে নানা আয়োজন।

বছরের এই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা স্থানীয়রা এই উৎসবকে ঘিড়ে নারীর টানে বাড়িতে ছুটে আসে। অগ্রহায়ন এর নতুন ধানের পিঠা আর বাউতে ধরা দেশী মাছ এযেনো উৎসবের মাখামাখি। বছরের এই সময়ে মেয়ে জামাই দাওয়াত করা হয় গ্রাম অঞ্চল গুলোতে। দেশী মাছ, খেজুরের রস আর পিঠা পায়েসের সুগন্ধে মুখোরিত হয়ে উঠে পুরো গ্রাম। বিলে মাছ ধরার জন্য সব চাইতে বেশি ব্যবহার হয় পলো। কেউ ব্যবহার করে ঠেলা আর নানা প্রকারের নানা ধরনের জাল।

এই মাছ ধরার জন্য বয়সের কোন বাধ নেই। ছোট বড় আবাল বৃদ্ধা সকলেই অংশগ্রহন করে বাউত এর মাছ শিকারে। উৎসবের আনন্দে মেতে উঠে সকলে। এই বিলে দেশী বিভিন্ন প্রজাতের মাছ পাওয়া যায়। রুই, কাতল, বোয়াল, চিতল, সোল, গজারসহ আরো অনেক প্রকারের ছোট বড় মাছ। এই রাহুুর বিলের দুই পাশে বেশ কয়েকটি গ্রাম রয়েছে। প্রতিটি গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে বিলের এক পাশ থেকে মাছ ধরতে ধরতে অন্য পাশে গিয়ে উঠে। দিন শেষে ভাগ্য প্রশন্ন হলে চিৎকার দিয়ে উঠে বিশাল এক মাছ ধরার মধ্যদিয়ে।

এই উৎসবে স্থানীয়রা ছাড়াও জেলার বাহির থেকে সৌখিন মাছ শিকারীরা মাছ ধরার জন্য অংশ নেয়। সিরাজগঞ্জ, উল্লাপাড়া, নাটোর, পাবনার সদর, আটঘরিয়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ বিল পারের কয়েক হাজার মানুষ মেতে উঠে মাছ ধরা উৎসবে। ভোর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে যানবহন যোগে আসে মাছ শিকারিরা।
কথা হয় উৎসবে আসা শখের মাছ শিকারী হাসান মাহামুদের সাথে তিনি বলেন, মাছ শিকার আমার শখের একটি অংশ। প্রতি বছর জেলার যে সকল প্রান্তে বিলে বাউত উৎসব হয় সেখানে মাছ ধরতে যাই। বেশ ভালো লাগে মাছ ধরতে। বাড়ি থেকে ফজরের আযান দেয়ার পরে বের হয়েছি। মাছ ধরে তার পরে বাড়ি যোবো। ভাগ্য সহায় হলে বিলের সবচাইতে বড় মাছ আমি পেতে পারি।

নাটোর থেকে আসা মাছ শিকারী সুলতার আহম্মেদ টিুপু বলেন, এই গ্রামে আমার আত্মিয়া রয়েছে। তার মাধ্যমে খবর পেয়ে গতকাল এখানে এসেছি। সকলের সাথে বিলে মাছ ধরবো খুব আনান্দ হবে। তবে বিলের পানিতে অনেক খুন খাকতে হয়। তাই প্রচুর পরিমানে তেল নিয়েছি গায়ে। উন্মুক্ত বিলে মাছ ধরার আনন্দই আলাদা।
স্থানীয় মাছ শিকারী আশরাফুল রনি বলেন, বিলে আগের মত আর মাছ পাওয়া যায় না। ছোট বেলাতে বাবার সাথে বাউতে মাছ ধরতে আসতাম। অনেক মাছ পাওয়া যেতো তখন। আর এখন এতো মানুষ মাছ পাওয়া যায় খুবই কম। তবে এবার বর্ষার সময় পানি হয়েছে অনেক বাজারে মাছ ও পাওয়া গেছে বেশ ভালই। আশা করা যায় সব ধরনরে মাছ ধরা পরবে। এই আনান্দ আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।

বাউত উৎসব নিয়ে কথা হয় ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ আশরাফুজ্জামান এর সাথে তিনি বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের অংশ এই বাউত উৎসব। আমার উপজেলাসহ পাশের আরো দুটি উপজেলার বেশ কিছুর অংশ চলন বিল এলাকা। এই বিলে প্রচুর পরিমানে দেশী মাছ পাওয়া যায়। বছরের নিদৃষ্ট সময়ে এই রুহুল বিলে মাছ ধরার উৎসব হয়। শৌখিন মাছ শিকারিরা প্রতি বছর এই উৎসব পালন করে থাকে। আমরা উৎসবের আনন্দকে সুন্দর ভাবে পালন করা জন্য গ্রাম্য প্রধানদের অনুরোধ করি। এই উৎসবকে ঘিরে বিল পারের গ্রাম গুলোতে চলে উৎসবরে আমেজ। শীতের পিঠা আর বিলের মাছ বেশ মজা হয় উৎসবকে ঘিড়ে।

তিনি বলেন, বিলে দেশী মাছ সংরক্ষনের জন্য সরকারি ভাবে নানা উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। বিলের জলাশ^য় অবমুক্ত করা জন্য মৎস্য অভয় অরন্যসহ সংশ্লিষ্ঠ অধিদপ্তর বিলে প্রতিবছর সরকারি ভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করছে। বিলে যদি মাছ না থাকে তা হলে এই উৎসব হারিয়ে যাবে। তাই দেশী মাছ আমাদের সংরক্ষন করতে হবে। কারেন্ট জাল ব্যবহার করা যাবেনা। তবেই আমরা এই উৎসব প্রতিবছর করতে পারবো। বাংলা ঐতিহ্য ধরে রাখার দাযিত্ব আমাদের সকলের।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *