পাবনায় আ.লীগের প্রার্থী ঘোষণায় নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা

রফিকুল ইসলাম সুইট, পাবনা : পাবনার ৫টি নির্বাচনী আসনেই মনোনয়ন ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনার ৫টি আসনে আওয়ামী লীগ থেকে যারা মনোনয়ন পেলেন তারা হলেন- পাবনা-১ (সাথিয়া-বেড়ার আংশিক) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, রাকসুর সাবেক জিএস ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ্যাড.শামসুল হক টুকু, পাবনা-২(সুজানগর-বেড়ার আংশিক) জেলা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহমেদ ফিরোজ কবির, পাবনা-৩( চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর) জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য মো. মকবুল হোসেন, পাবনা-৪(্ঈশ্বরদী- আটঘরিয়া) জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য ভুমি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, পাবনা-৫ (পাবনা সদর) জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স।

জনপ্রিয় এই ৫জনের মনোনয়ন পাওয়ায় পাবনার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে আনন্দের বন্যা। বিভিন্নভাবে মনোনয়নের খবর ছডিয়ে পড়ে পাবনার মানুষের মধ্যে। মনোনয়নের খবর পাওয়ার পর ইসি আইন থাকায় মিছিল মিটিং না করতে পারলেও মিষ্টি খাওয়া, কোলাকুলি, রং মাখামাখি, শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেছে দলীয় নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এ ব্যাপারে সুজানগর উপজেলার সাতবাড়ীয়ার আনোয়ার হোসেন (জেলা কৃষকলীগ নেতা) জানান, পাবনার ৫টি আসনেই জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিষেশ করে আহম্মদ ফিরোজ কবির পাবনা-২ আসনে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। তাকে মনোনয়ন দেয়ায় পাবনা-২ আসনের সকল স্তরের জনগণ ব্যাপক খুশি।

চাটমোহরের মোত্তালিব মিয়া (কলেজ শিক্ষক) জানান, আওয়ামী লীগ পাবনা-৩ আসনে একজন যোগ্য এবং জনপ্রিয় নেতাকে মনোনয়ন দিয়েছে। পাবনা-৩ আসনের জনগণ তাকে সাদরে গ্রহন করেছে।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এ্যাড. আব্দুল আহাদ বাবু জানান, পাবনার ৫টি আসনেই আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় ব্যাক্তিদেরকে যোগ্যতার বিবেচনায় মনোনয়ন দিয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
পাবনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল জানান, পাবনার ৫টি আসনেই যোগ্য এবং জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ৫ জনের মনোনয়নে পাবনাবাসী খুশি। আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৫টি এমপিই উপহার দেবে পাবনাবাসী।

পাবনা-১: পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সম্পূর্ণ এবং বেড়া উপজেলার আংশিক এলাকা নিয়ে পাবনা-১ আসন। ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৭ হাজার ৫৬২।

কোন জোটের একক অবস্থান না থাকায় একাধিক বার বিজয়ী হয়েছেন উভয় জোটই। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন জামায়াতের মাও. মতিউর রহমান নিজামী। ১৯৯৬ সালে জামায়াতের নিজামী ও বিএনপির মেজর (অব:) মঞ্জুর কাদেরকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। ২০০১ সালে আবু সাইয়িদকে প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পায় ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী মাও. নিজামী। ২০০৮ সালে সংস্কারপন্থী হিসেবে বহিস্কৃত হোন আবু সাইয়িদ। ফলে নৌকার নতুন মাঝি হয়ে অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু জামায়াতের আমির নিজামীকে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে জামায়াত-বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোট। সেবার নৌকার প্রার্থী শামসুল হক টুকুর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। সাইয়িদের করা নানা অনিয়ম কারচুপির অভিযোগের ওই নির্বাচনে ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পায় টুকু।

পাবনা-২: পাবনার সুজানগর উপজেলা ও বেড়া উপজেলার ৫টি ই্উনিয়ন নিয়ে গঠিত পাবনা-২ আসন। এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৩লক্ষ ৩৩৪। ১৯৯১ সালে এই আসনে আ.লীগের আহম্মদ তফিজ উদ্দিনকে ১৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পায় বিএনপির প্রার্থী ওসমান গণি খান। পরের বার ১৯৯৬ সালে মাত্র ১৫শ ভোটের ব্যবধানে নৌকার তফিজ উদ্দিন কাছে পরাজিত হোন ধানের শীষের ওসমান গণি। ২০০১ সালে দুই দলেরই প্রার্থী পরিবর্তন হয়। সেবার আ.লীগের মির্জা আব্দুল জলিলকে প্রায় ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব। ২০০৮ সালে উপনির্বাচনে নৌকার নতুন প্রার্থী মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারের কাছে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে হেরে যায় সেলিম রেজা হাবিব। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে আজিজুল হক আরজু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পাবনা-৩: চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন ভোটার সংখ্যা ৪লক্ষ ২ হাজর ৬২৭। ১৯৯১ সালে বিএনপির বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান সাইফুল আযম আওয়ামী লীগের ওয়াজি উদ্দিন খানকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াজি উদ্দিন খান নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কে এম আনোয়ারুল ইসলাম কে হারিয়ে। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলাম জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিল মকবুল হোসেন কে হারিয়ে। ২০০৮ সালে জয়ের মুখ দেখেন মকবুল হোসেন বিএনপির প্রার্থী ছিল সাইফুল আযম কে হারিয়ে। ২০১৪ সালেও জয়ী হয় মকবুল হোসেন।

পাবনা-৪: আসনে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে চার বার আওয়ামীলীগ প্রার্থী এবং একবার বিএনপি প্রার্থী জয় লাভ করেন। ১৯৯১ সালে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সরদার (সিরাজ সরদার) আওয়ামীলীগ প্রার্থী ছাত্রলীগের তৎকালীণ সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিবকে পরাজিত করেন। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে হাবিবুর রহমান হাবিব যোগ দেন বিএনপিতে। ঐ নির্বাচনে শামসুর রহমান শরিফ ডিলু আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম সরদার। এই জয়ের মধ্য দিয়েই কপাল খুলে যায় শামসুর রহমান শরিফের। পরপর ৪টি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন এবং সর্বশেষ ভূমিমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত একক আধিপত্ত্ব রয়েছে শামসুর রহমান শরিফ ডিলুর। ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬১ হাজার ৯৮৯।

পাবনা-৫: আসন থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুস সুবহান আওয়ামীলীগ প্রার্থী রফিকুল ইসলাম বকুলকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। এক সময়ের প্রভাবশালী নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল আওয়ামীলীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকারকে পরাজিত করে বিএনপি প্রার্থী বকুল নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত নেতা মাওলানা আবদুস সুবহান আওয়ামীলীগ প্রার্থী ওয়াজি উদ্দিন খানকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সেই সময়ে আওয়ামীলীগের উদীয়মান নেতা হিসেবে পরিচিত বর্তমান জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে চার দলীয় জোটের প্রার্থী জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুস সুবহানকে পরাজিত করেন। ২০১৪ সাল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোলাম ফারুক প্রিন্স বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন।

বর্তমানে পাবনা পৌরসভা ও সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোট রয়েছে ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮২৩।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *