পাবনা-৪ আসনে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ : নির্বাচন বাতিলের দাবী বিএনপি প্রার্থীর

নিজস্ব প্রতিবেদক : ব্যালট পেপার ভোট কেন্দ্রে সকালে পৌঁছানোর কারণে এক ঘন্টা পিছিয়ে শনিবার সকাল ৯ টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয় পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) সংসদীয় আসনের নির্বাচনে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাররা স্বতঃর্স্ফূত ভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে দাবী করেন আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাস।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন শৃংখলা বাহিনীর উপর অনাস্থা এনে নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ এসে ভোট বাতিল চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপির ধানের শীর্ষ মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব। অন্যদিকে পাবনা প্রেসক্লাবের পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছেন আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতারা।

শনিবার বেলা সাড়ে ৯টায় পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ভোট কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাস। এ সময় তিনি উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মিদের বলেন, নির্বাচনে হার-জিত থাকবে। যে কোন ফলাফল মেনে নিতে প্রস্তুত আছি। আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার প্রতিপক্ষের প্রার্থী নানা অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, আমি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবো। তাই জনগণই রায় দেবেন কে হবেন এই আসনের জনপ্রতিনিধি। তাদের উপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমি শেষ পর্যন্ত মাঠে আছি বলে জানান এই প্রার্থী।

অন্যদিকে বিএনপির ধানের শীর্ষের প্রার্থী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মন্তলীর সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ অঞ্চলে এসেছিলেন। তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন কোন বিশৃংখলা, অনিয়মকে উর্দ্ধে রেখে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তিনি তার কথা রাখেননি। পাবনার পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনিও তার কথা রাখেননি। নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক ও পরিকল্পিত কর্মকান্ডের কারণেই এই নির্বাচন বাতিলের দাবী জানাচ্ছি।

শনিবার বেলা সাড়ে ১১ টায় নিজ বাসভবনে এক সংআদ সম্মেলনের তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগের বিবাদমান দু’গ্রুপ নিজেরাই নির্বাচনী কার্যালয় ভাংচুর, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অথচ এর দায় চাপিয়েছে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের উপর। মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্বাচনের আগে নেতাকর্মিদের ঘরছাড়া করেছে। বাড়ি ছাড়া করেছে। হাবিব বলেন, প্রহসনের এই নির্বাচনের কারনেই আমি নিজে ভোট কেন্দ্রে যাইনি। আমার কোন নেতাকর্মিদের যোগ দেয়নি। সেখানে নির্বাচনী এজেন্ট দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

এদিকে বিএনপির সাংবাদিক সম্মেলনের পরপরই পাবনা প্রেসক্লাবের ভিআইপি অডিটোরিয়ামে পাল্টা সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আওয়ামীলীগ। এতে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বিএনপির প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ওনাদের পায়ের তলায় মাটি নেই। দিকবিদিক শূন্য। বিএনপি সেই দল, যে দলের কথার সাথে কাজের কোন মিল নেই। জনগণের পাশাপাশি তাদের কর্মিরাও তাদের বিশ্বাস করে না। বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব নির্বাচন করতে এখানে আসেননি। তিনি আসছেন নির্বাচনের নামে বাণিজ্য করতে। নির্বাচনে প্রার্থীর নামে নির্বাচনকে প্রশ্ন বিদ্ধ করাই উনার অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। যার প্রমাণ তিনি ইতোমধ্যেই আপনাদের দিয়েছেন।

আওয়ামীলীগের এই সংবাদ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক, বিশিষ্ট শিল্পপতি অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু, পাবনা-৫ সদর আসনের সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স, পাবনা-সিরাজগঞ্জ সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নাদিরা ইয়াসমিন জলি, জেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল রহিম লাল, বীরমুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান হাবিবসহ জেলা আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

এদিকে পাবনা-৪ আসনের ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলার বেশ বেশ কয়েকটি ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভোট গ্রহণের শুরুতে ভোটারদের উপস্থিতি ভালোই ছিল। বেলা গড়ার সাথে সাথে ভোটার উপস্থিতি কমতে থাকে। তবে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জামিরুল ইসলাম বলেন, সকাল ৯ টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। বেলা দশটার দিকেই এই কেন্দ্রে ২০ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তার কেন্দ্রে ৩৪০০ ভোটার ছিল। সাহাপুর শহীদ আবুল কাশেম উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোহাম্মদ আলী বলেন, তার কেন্দ্রে ৩৪৮৮ জন ভোটার ছিলেন। সকাল থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত সন্তোষজনক ভোট পড়েছে বলে দাবী করেন। অনুরুপভাবে আটঘরিয়া উপজেলার দেবোত্তর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদভা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সড়াবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে শান্তিপুর্ণ ভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে বলে জানান দায়িত্বরত প্রিসাইডিং অফিসাররা।

তবে সরেজমিনে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ঘুরে দেখা যায় বিএনপি প্রার্থীর কোন এজেন্ট দেয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বস্ব প্রিসাইডিং অফিসাররা বলেন, বিএনপি প্রার্থী কেন এজেন্ট দেননি সেটা জানিনা। তবে তাদের উপস্থিতি আমরা পাইনি। কেন্দ্রে আসতে বাঁধা দেয়া, জোর পূর্বক কেন্দ্র দখল বা কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি এমন বিষয় জানতে চাইলে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার বা নিয়োজিন আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, কোন ধরণের বাঁধা বা চাপ সৃষ্টির কোন ঘটনা ঘটেনি। বরং তাদেরকেই আমরা পাইনি।

জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা সিনিয়র নির্বাচন অফিসার আব্দুল লতিফ শেখ জানান, পাবনা জেলার ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৪ আসন। এ আসনে দু‘টি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন রয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮১ হাজার ১১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯১ হাজার ৬৯৭ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪১৫ জন। ১২৯টি কেন্দ্রে এ সকল ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এসব ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণের জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন ২ হাজার ৩শ’ ১ জন প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার। প্রয়োজনীয় সংখ্যক, র‌্যাব, পুলিশ এবং ১৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট আইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বলে জেলা প্রশাসন জানান। এছাড়াও র‌্যাব ও পুলিশের টহল ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে।

পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, কোথায়ও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সবাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দান করেছেন। অবাধ, সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে চার স্তুরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তিনি বলেন, ১ হাজার ১শ’ পুলিশ সদস্য, ১ হাজার ৫৪৮ জন আনসার সদস্য ও আট প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। দায়িত্বে আছেন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের ভ্রাম্যমান একাধিক টিম ও র‌্যাবের টহল।

বিকেল সাড়ে ৫ টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ শেষে ভোট গননা চলছিল। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত: গত ২ এপ্রিল পাবনা জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, সাবেক এমপি ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী, ভাষাসৈসিক, বীরিমুক্তিযোদ্ধা বর্ষীয়ান রাজনীতিবীদ শামসুর রহমান শরীফ ডিলু না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তীতে তফশিল ঘোষনা দেয় নির্বাচন কমিশন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *