বরেণ্য সাহিত্যিক পাবনার কৃতি সন্তান রশীদ হায়দারের চিরবিদায়

পিপ (পাবনা) : বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, বাংলা একাডেমি ও নজরুল ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক রশীদ হায়দার (৭৯) ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রজিউন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই শোকজ্ঞাপন করেছেন।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘রশীদ হায়দার ছিলেন বাংলা সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি গল্প-উপন্যাস-নাটক-অনুবাদ-নিবন্ধ-স্মৃতিকথা ও সম্পাদনা মিলিয়ে ৭০ এর অধিক বই রচনা করেছেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণায় তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা কথাসাহিত্যে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।’ মৃত্যুও সংবাদ প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জন্মস্থান পাবনায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

পাবনা-৫ আসনের এমপি গোলাম ফারুক প্রিন্স, পাবনা জেলা পরিষদের প্রশাসক রেজাউল রহিম লাল, পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ, পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ বি এম ফজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক সৈকত আফরোজ আসাদ, লেখক-গবেষক ড. এম আবদুল আলীমসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শোক প্রকাশ করেন। তাঁর জন্ম ১৯৪১ সালের ১৫ই জুলাই, জন্মস্থান পাবনা সদর উপজেলার দোহারপাড়া গ্রামে। পিতা হাকিম উদ্দিন শেখ, মাতা রহিমা খাতুন। তিনি ১৯৫৯ সালে গোপালচন্দ্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৬১ সালে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি নাটক বিষয়ে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় অধ্যয়ন করেন। কর্মজীবন শুরু ১৯৬১ সালে সাপ্তাহিক ‘চিত্রালি’ পত্রিকায়। পরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে চাকুরি করেন। ২০০৯ সাল থেকে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। গল্প, কবিতা, নাটক, অনুবাদ, উপন্যাস মিলিয়ে প্রকশিত গ্রন্থসংখ্যা সত্তরটির মতো অধিক। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হল Ñ উপন্যাস : খাঁচায় (১৯৭৫ সালে), নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্যে (১৯৮২), সাধ আহ্লাদ (১৯৮৫), অন্ধ কথামালা (১৯৮৭), অসম বৃক্ষ (১৯৮৭), মাবূহাই (১৯৮৮) ; ছোটগল্প : নানকুর বোধি (১৯৬৭), অন্তরে ভিন্ন পুরুষ, তখন (১৯৮৭), আমার প্রেমের গল্প (১৯৮৮), পূর্বাপর (১৯৯৩), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯), বাবার গল্প (১৯৯৯), সীমা পরিসীমা (২০০১), গন্তব্য (২০০২), নির্বাচিত গল্প ও সামান্য সঞ্চয় (২০০৩), যুদ্ধ ও জীবন (২০০৫) ; নাটক : তৈল সংকট (১৯৭৪), শেক্সপীয়র দ্য সেকেন্ড (১৯৮৫) ; শিশুসাহিত্য : গোলাপের জন্ম (১৯৭৭), গোলপাতা গোলাপ (১৯৭৮), যদি দেখা পাও (১৯৮১), পুনর্জন্ম (১৯৯২), জসীমের নকশি কাঁথা (২০০১), শোভনের স্বাধীনতা (২০০২) ; স্মৃতিকথা : ওবেলা এবেলা (১৯৯৩) ; জীবনী : হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৮৮) ; অনুবাদ : কাঠগড়া (১৯৮৪) ; সম্পাদনা : শহিদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রস্থ (১৯৮৫) ; স্মৃতি : ১৯৭১ (১-১৩ খ-), ভয়াবহ অভিজ্ঞতা (১৯৮৯), খুঁজে ফিরি (২০০০), স্মৃতিময় ১৯৬৫ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১ম ও ২য় খ-), অসযোগ আন্দোলন : একাত্তর (১৯৮৫), বাংলাদেশের খেলাধুলা (১৯৯৪), বাঙালির তীর্থভূমি (১৯৯৯)। সাহিত্য আদানের জন্য অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার (১৯৮২), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮৪), হুমায়ুন কাদির পুরস্কার (১৯৮৭), একুশে পদক প্রভৃতি লাভ করেন। উল্লেখ্য, রশীদ হায়দারের ভাই জিয়া হায়দার, দাউদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, আরিফ হায়দারও সাহিত্য-সংস্কৃতি-জগতের আলোকিত মুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *