বিচারকের অবস্থান ও কর্তব্য নিয়ে ইসলাম কি বলে?

ধর্মপাতা: মো. আবদুল মজিদ মোল্লা: আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বিচারক যখন বিচার করে এবং বিচারকাজে (সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে) যথাযথ প্রচেষ্টা চালায় আর তার রায় সঠিক হয়, তবে তার জন্য দুটি নেকি। আর বিচারক যখন বিচার করে এবং বিচারকাজে যথাযথ প্রচেষ্টা চালায় (ইজতিহাদ করে) আর তার রায় ভুল হয়, তবে তার জন্য একটি নেকি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৫২)

আলোচ্য হাদিসে মহানবী (সা.) বিচারকাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের যেমন যথাযথ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি তাদের শ্রমের পুরস্কারও ঘোষণা করেছেন। ইসলামি বিধান মতে, একজন বিচারক সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থেকো। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কোরোÑএটি আল্লাহভীতির নিকটতর। আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে খবর রাখেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)

বিচারক কে?
হাদিসে ‘হাকিম’ বা বিচারক শব্দ ব্যবহার করা হলেও আইন, বিচার ও শরিয়তের বিধি-বিধান নিয়ে চিন্তা, গবেষণা ও কাজ করেনÑএমন সবাই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। এ হিসেবে মসজিদের ইমামÑযিনি মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেন, ফতোয়া কাজে নিয়োজিত আলেমÑযা ধর্মীয় বিধি-বিধান নির্ণয় করেন তারাও হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হবেন।
গভীর জ্ঞানের অধিকারীরাই বিচারক হবেন
আলোচ্য হাদিস থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, যিনি বিচারকাজে নিযুক্ত হবেন তিনি বিধান উদ্ভাবন, সত্য-মিথ্যা যাচাইকরণ এবং দলিল-প্রমাণ মূল্যায়নের যোগ্যতা রাখেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! যখন তোমাদের কাছে কোনো ফাসিক ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসে, তোমরা তা যাচাই কোরো।’ (সুরা : হুজরাত, আয়াত : ৬)
মূর্খ ও অযোগ্যদের বিচারক পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। বিশেষত বিচারকাজে নিযুক্ত ব্যক্তি অবশ্যই কোরআন, সুন্নাহ, ইসলামি আইনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে পূর্ববর্তী আলেমদের মতামত এবং কিয়াস (অন্য বিধানের আলোকে বিধান উদ্ভাবন) করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা জরুরি। (আস-সুলতাতুল কাদায়িয়া, পৃষ্ঠা ১৪৩)

বিচারকাজের বিধান
ইসলামী শরিয়ত মতে বিচারকাজের ধারা অব্যাহত রাখা ফরজে কেফায়া। মুসলিম সমাজের একটি অংশ মানুষের ভেতর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকলে অন্যরা দায়মুক্ত হয়ে যাবেন। নতুবা সমাজের সবার ওপর ফরজ ত্যাগের দায় বর্তাবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে দাউদ! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে বিচার কোরো।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ২৬)

বিচারকের অনন্য মর্যাদা
ইসলাম ন্যায়নিষ্ঠ বিচারকের অনন্য মর্যাদা দান করেছে। কেননা ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক সমাজে অবিচারের পরিবর্তে সুবিচার, অপরাধের পরিবর্তে শৃঙ্খলা, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়, মন্দের পরিবর্তে ভালো প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত।

ভুল করলেও প্রতিদান : রাসুলুল্লাহ (সা.) আলোচ্য হাদিসে ন্যায় অনুসন্ধানী বিচারকের জন্য ভুল ও সঠিক উভয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিদান ঘোষণা করেছেন।
নবী-রাসুলদের কাজ : পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত থেকে নবী-রাসুলদের বিচারকাজে আত্মনিয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমনÑআল্লাহ বলেন, ‘হে দাউদ! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছি। সুতরাং তুমি মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে বিচার কোরো।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ২৬)
ভালোবাসা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তুমি বিচার করো, তখন তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে ফায়সালা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৫)

বিচারকদের প্রতি হুঁশিয়ারি
ইসলাম যেমন বিচারকের জন্য পুরস্কার ও মর্যাদা ঘোষণা করেছে, তেমনি বিচারকদের সতর্কও করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যাকে মানুষের মধ্যে বিচারক বানানো হলো, তাকে ছুরি ছাড়া জবাই করা হলো।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৪/৫০৫)
আল্লাহ সবাইকে ন্যায়বিচার করার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *