বেড়ার কাকেশ্বরী নদী পুনঃখননে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, পাবনা : পাবনার বেড়া উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত কাকেশ্বরী নদীর পুনঃখনন কাজের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নদী খননের মাটি বিক্রি, টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালিদের অবৈধ ঘর উচ্ছেদ না করা ও দরপত্রের নিয়ম না মেনে খনন করা সহ নানান অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, দেশের ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন (১ম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বেড়ায় চলছে ডি-২ কাকেশ্বরী নদীর পুনঃখনন প্রকল্প। এর বাস্তবায়ন করছে বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন ঠিকাদার নুরুজ্জামান মিয়া। তার ঠিকানা হিসেবে দেওয়া আছে বেড়া নলখোলা হাট পুরান ভারেঙ্গা বেড়া, পাবনা। তবে মাঠে কাজ করছে ঠিকাদার কালু মল্লিক। খনন করা মাটি পাড়ে না ফেলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিকট সিন্ডিকেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায় ঠিকাদারের শ্যালক কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

বেড়া পাউবো সুত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় গতবছরের এপ্রিল মাসে সাঁথিয়া উপজেলার ডি-৩ সুতিখালি ও ডি-২ কাকেশ্বরী নদীর পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন হয়।

সাঁথিয়ার সাতানিরচর থেকে বেড়া কৈটলা সুইজ গেট পর্যন্ত সাড়ে ১৯ কিঃ মিঃ কাকেশ্বরী নদী পুনঃখনন করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। গতবছর বর্ষার আগ মুহুর্তে কিছুটা খনন করা হয়। পরবর্তি কাজ এবছর ২৭ জানুয়ারি থেকে শুরু করা হয়ে ২ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। খননের পাশাপাশি নদীর দুই পাড় মাটি ফেলে রাস্তা বেধে গাছ লাগানোর কথা রয়েছে।

জানা যায়, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি নোটিশ এবং মাইকিং করে ১৭ জানুয়ারির মধ্যে নদীর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা সড়িয়ে নেয়ার আহ্বান জানান বেড়া পাউবো। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভুমিহীন দরিদ্ররা নিজেদের দোকান, বসত ঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়। জায়গা খালি করে দিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে জীবন যাপন করছে। দিন মুজুর অনেকেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছেন কেউ এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন আত্নীয় বাড়িতে । কিন্তু প্রভাবশালীদের পাকা একতলা ভবন নদীর পাড়ে রেখেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

পাঁচুরিয়া খাসপাড়া গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি হান্নান মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘নদী কাটার নামে তামাশা শুরু হইচে, আগেই ভালো আছিল নদী। এহন যে নদী কাটতিচে আষাড় মাস আসলিই বুঝা যাবিনি কি হয় পাড়ের সব মাটি ধুয়ে নিচে যাবিনি। দেখেন শনিবার রাতের অল্প বৃষ্টিতেই কত খানি ভেঙ্গে গেছে পাড়ি। দুই তিন ফিট করে খাল করে খালি পাড় বেধে নদী কাটার নাম করে যাচ্ছে। শুধু গরিব মানুষ গেড়ে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে অশান্তির ভিতর আছে।

কৈটোলা কুটিরশর থেকে চাকলা একই ডাক নামক স্থান পর্যন্ত প্রায় ৪ কিঃ মিঃ কাজ শেষের দিকে। গত বছর সাঁথিয়ার সাতানির চর থেকে বড়গ্রাম দত্তপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩ কিঃ মিঃ কাজ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

সুত্র জানায়, নিয়মানুসারে ৪ দশমিক ১০ মিটার লেবেল অনুসারে খনন হচ্ছে না নদী। ৬২ ফিট চওড়া করে খনন করার কথা থাকলেও বেশির ভাগ জায়গায় সে নিয়ম মানছে না ঠিকাদার।

কৈটোলা, পাচুরিয়া, খাকছাড়া গ্রামে নদীর পাড়ে অবৈধ প্রায় ১০-১৫টি পাকা একতলা ভবন না ভেঙ্গে মাটি ফেলে কাজ চলছে। কালিবাজার নামক স্থানের নদী খননের মাটি বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সিদ্দিক মোল্লার নতুন বাড়ি ১হাজার টাকা দরে প্রতি ট্রলি মাটি বিক্রি করছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় অনেক জায়গায় একইভাবে মাটি বিক্রি করে আসছে।
উপজেলার চাকলা ইউনিয়নের নয়া পাচুরিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক বাড়ি ভরাটের কাজ করছে, জানতে চাইতেই নুর হোসেন জানায়, আমার জায়গার মাটি আমি কিনে আরেকটা নতুন বাড়ি ভরাট করছি। তিনি জানান নদীর ধারে আমার বাড়ি ছিল, আমার বাড়ি ভেঙে নিয়েছি সেই জায়গায় থেকে বেকু দিয়ে মাটি কেটে রেখেছে সেই মাটি আমি ৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি। আমি দুই বছর আগে এই একওয়ারে জায়গা ৫৮ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলাম।

তাঁরাপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায় রবিউল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির নদীর পাড়ে থাকা একটি অর্ধেক দেওয়াল ঘর তারা নিজেরাই ভেঙ্গে নিয়েছে।
অপরদিকে একই সারিতে থাকা এরশাদ মোল্লা ও মাজেদ মোল্লার নদীর পাড়ে ছাদওলা দুইটি বিল্ডিং অক্ষত অবস্থায় রয়েই গেছে।

মুঠোফোনে এরশাদ মোল্লা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমার ঘরটা নদীর জায়গায় এটা সত্য, আমি অনেক টাকা খরচ করে ঘর দিয়েছি। কন্টেকটারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরটা রেখে দিছি। তবে আমার ঘরের সামনে মাটি ফেলার জায়গা দিয়েছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, আমরা গরিব মানুষরা ঠিকই ঘর সড়া নিলেম, বড়লোকদের ঘড় থাইহেই গেল।

নদী খনন কাজের অনিয়মের ব্যাপারে ঠিকাদার কালু মল্লিক এর কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার কাছে এ ব্যাপারে বলা আমার কি খুব জরুরি? আপনি বেড়া সিএন্ডবি আমার অফিসে আইসেন।

বেড়া পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল হামিদ বলেন, খনন কাজে অনিয়ম করলে বিল পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ঢাকা থেকে আমাদের টিম আসবে তারা যে রিপোর্ট দিবে সে অনুযায়ী বিল হবে। আর মাটি বিক্রির কোন নিয়ম নেই। যদি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান মাটি নিতে চায় সেক্ষেত্রে ঐ প্রতিষ্ঠানের আবেদন করতে হবে এবং জন প্রশাসনের সুপারিশের ভিত্তিতে দেওয়া যেতে পারে।

বেড়া ইউএনও আসিফ আনাম সিদ্দিকী জানান, কাকেশ্বরী নদী পুনঃখনন কাজের অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেলে বিষয়টা অবশ্যই খতিয়ে দেখবো।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!