বেড়ায় ইটভাটায় কৃষকের সর্বনাশ : নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আম কলাসহ নানা ফসল

পিপ (পাবনা) : পাবনার বেড়া উপজেলার জাতসাকিনী ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষের দু:খ অর্ধডজন ইটভাটা। এই ইটভাটা নির্মিত হওয়ার পর থেকেই গ্রামের আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, কলাসহ বিভিন্ন ফলের গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। এক সময় এসব গাছ থেকে প্রচুর ফল পাওয়া গেলেও এখন আর তেমনটি পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু কিছু গাছে ফল টিকে গেলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত পচে যায় নয়তো স্বাদে মারাত্মক তিতা বা টক হয়। এ ছাড়া গ্রামগুলোর শত শত বিঘা জমির ধান, পাটসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলের ফলনেও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গ্রামবাসীর অভিযোগ ইটভাটাগুলো নির্মাণ হওয়ার পর থেকে ফসল উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে।
সিন্দুরী গ্রামের মো. পলাশ হোসেন বছর দশেক আগে তাঁর পাঁচ বিঘা জমিতে আম, লিচু ও কলাচাষের একটি প্রকল্প গড়ে তোলেন। সেখান থেকে ভালোই আয় হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু চার-পাঁচ বছর ধরে আয় দূরে থাক লোকসান সামাল দেওয়াই মুশকিল হচ্ছে। এভাবে লোকসান হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি তাঁর প্রকল্পের কাছে গড়ে ওঠা ছয়টি ইটভাটাকে দায়ী করেছেন। এসব ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় তাঁর কলাবাগানের কলাগাছগুলো ঝলসে গেছে। লিচু ও আমবাগানের গাছগুলোতে ফল ঝরে পড়ছে। সামান্য কিছু ফল টিকলেও সেগুলো হয় পচে যাচ্ছে নয়তো আকার ও স্বাদে বিকৃত হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁর ধান ও পাট ক্ষেতের অবস্থাও প্রায় একই রকম।
পলাশ হোসেন বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, ‘লোক প্রশাসন বিষয়ে সম্মান ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে গ্রামেই প্রজেক্টটি দাঁড় করেছিলাম। কিন্তু ইটভাটার ধোঁয়া আমার সব শেষ করে দিয়েছে। দুই বিঘা কালাবাগানে এবারও এক লাখ টাকার ওপরে বিনিয়োগ করেছি। সব কলাগাছের পাতা ঝলসে গেছে। এ অবস্থায় কোনো কলাগাছ থেকেই ফলন হচ্ছে না। আগে প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার আম বিক্রি করতাম। অথচ এখন আমাকে আম কিনে খেতে হয়।’
শুধু পলাশ হোসেনই নন। কাছাকাছি অবস্থিত ছয়টি ইটভাটার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন সিন্দুরী, মির্জাপুর, বাগমির্জাপুর, দাতিয়া, রাণীগ্রাম, খাস আমিনপুর, আমিনপুরসহ অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাগমির্জাপুর ও খাস আমিনপুর গ্রামে গত পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে একে একে গড়ে ওঠে ছয়টি ইটভাটা। সেগুলো হলো- ম-ল, একতা, সততা, মাস্টার, সততা প্লাস-১ ও সততা প্লাস-২ নামের ইটভাটা। এগুলোর মালিকানা ও পরিচালনায় রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
সিন্দুরী গ্রামের আকমল শেখ বলেন, ‘আমার চার বিঘা জমিতে একসময় ধান, পাট ও গম আবাদ করে প্রচুর ফলন পেতাম। এখন অর্ধেক ফলনও পাই না। ধানের শীষগুলো বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো যেন ঝলসে যায়। আবার ভাটার গ্যাসে ঘরে থাকা যায় না। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়।’
সিন্দুরী, বাগমির্জাপুর, মির্জাপুর গ্রামের ১০ থেকে ১২ জন বার্তা সংস্থা পিপ‘কে জানান, বর্ষা মৌসুম চলে আসায় আপাতত ইটভাটাগুলো বন্ধ আছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুম শেষ হতে না হতেই আবার এগুলো চালু হবে। তাঁরা জানান, চালু থাকাকালে ইটভাটার লোকজন কৌশল করে রাতে বিষাক্ত গ্যাস ছেড়ে দেয়। যখনি গ্যাস ছেড়ে দেয় তখন কারো ঘরে থাকার উপায় থাকে না। প্রচ- কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয় সবার। আর এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও ভাটার লোকজন হুমকি দেয়।
এলাকাবাসী জানান, ভাটাগুলোর মালিকেরা স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শুধু দুটি ভাটার মালিকানার অংশীদার বিএনপির স্থানীয় এক নেতা। এর মধ্যে মাস্টার ব্রিকফিল্ড নামের ইটভাটার মালিক মোখলেসুর রহমান বেড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাতসাকিনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজাউল হক বাবুর ভাই। ম-ল ব্র্রিকফিল্ডের মালিক কাবুল ম-ল জাতসাকিনী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক। সততা ও একতা ব্রিকফিল্ডের মালিক যথাক্রমে মো. শাহজাহান ও মজনু ম-ল দুজনেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা বলে পরিচিত। অন্যদিকে সততা প্লাস-১ ও সততা প্লাস-২ ব্রিকফিল্ড দুটির মালিক অংশীদার ভিত্তিতে কালাম ম-ল ও আবু হানিফ। এর মধ্যে কালাম ম-ল স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও আবু হানিফ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
এ ব্যাপারে মাস্টার ব্রিকফিল্ড নামের ইটভাটার মালিক মোখলেছুর রহমান বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, ‘ইটভাটাগুলোর কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতিই হচ্ছে না। গাছপালা, ফল ও ফসলের ক্ষতির ব্যাপারে এলাকাবাসী আমাদের কাছে কখনও কোনো অভিযোগ করেনি। তবে ঈর্ষান্বিত হয়ে কোনো মহল হয়তো এ ব্যাপারে অভিযোগ দিতে পারে। আর আমরা (ইটভাটা মালিকেরা) পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছি।’
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়টি ভাটাই গড়ে উঠেছে এলাকার কৃষিজমিতে। এসব কৃষিজমির কিছু অংশ ইটভাটা মালিকদের নিজস্ব। আর বাকি অংশ স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনবসতি ও ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর ওপর এগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদনও নেই। ভাটাগুলো গড়ে তোলার সময় স্থানীয়রা বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন তাঁরা। ইটভাটা নির্মাণের সময় এগুলোর মালিকেরা বলেছিলেন পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু তাঁরা করবেন না। কিন্তু বর্তমানে এসব ইটভাটায় স্থানীয়রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চালু থাকাকালে ভাটাগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়ার সঙ্গে বিষাক্ত গ্যাস চারপাশে পরিবেশসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে বলে জানান স্থানীয়রা। এতে ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেতই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, গাছপালাসহ নানা রকমের ফলের গাছও ঝলসে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ভাটাগুলোর পাশর্^বর্তী এলাকার ফল ও ফসলের। এদিকে ইটভাটার ধোঁয়ায় ঠিক কি পরিমাণ ফসলি জমি ও ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার তথ্য উপজেলা কৃষি কার্যালয় দিতে পারেনি। তবে স্থানীয় কৃষকরা জানান, ১০টি গ্রামের অন্তত ৩০টি ফলের বাগান ও আড়াই হাজার বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
বেড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশকর আলী বার্তা সংস্থা পিপ‘কে বলেন, ‘ইটভাটার কারণে ফসলি জমির ক্ষতি হওয়ার কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে তা সত্য হলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুতর। এ ব্যাপারে দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে ফসলি জমির ক্ষয়-ক্ষতির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও আমিনপুর থানা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল হক বাবু বলেন, ‘পরিবেশ আইনে ওই এলাকায় ইটভাটা থাকা হয়তো ঠিক না। তাই দুই-এক বছরের মধ্যেই ভাটাগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। তবে গোটা পাবনা জেলাতে কিন্তু এভাবেই ভাটাগুলো চলছে।’
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, ‘ইটভাটা সংক্রান্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে এ ব্যাপারে দ্রুত খোঁজ নিয়ে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *