বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় বাড়ছে অগ্নিকান্ড ও প্রাণহানির ঘটনা

এক্সক্লুসিভ: বৈদ্যুতিক গোলযোগে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে দেশে প্রাণহানি ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী গত বছর বৈদ্যুতিক গোলযোগে সারাদেশে ৭ হাজার ৮২৫টি ছোট-বড় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে, যা মোট অগ্নিকান্ডের ৩৯ শতাংশ। আর ২০১৭ সালে দেশে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা যায় ৩৬৪ জন। তবে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা তার কয়েকগুণ বেশি হবে। বিগত ২০১৬ সালে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৪২ শতাংশের পেছনে কারণ ছিল বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণই হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। দেশে বিদ্যুৎস্পর্শের দুর্ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য তেমন গবেষণা নেই। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত অক্টোবর মাসে বিদ্যুৎস্পর্শে মারা গেছে ৩৭ জন। ফায়ার সার্ভিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার মতো প্রতিদিনই বিদ্যুৎস্পর্শে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। সরকার এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যুর হার সড়ক দুর্ঘটনাকে ছাপিয়ে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে সরকার সারাদেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে। ওই লক্ষ্যে দ্রুতগতিতে বিদ্যুতের লাইনও সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিগত ২০০৯ সালে সারাদেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক ছিল এক কোটি ৮ লাখ। চলতি বছর তা বেড়ে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫১ লাখ। অর্থাৎ গত ১১ বছরে গ্রাহক বেড়েছে দুই কোটি ৪৩ লাখ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন সম্প্রসারণে গুণগত মান রক্ষা করা হচ্ছে কিনা সেদিকে তেমন নজর দেয়া হচ্ছে না। ফলে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা।
সূত্র জানায়, সারাদেশের অধিকাংশ গ্রামগঞ্জে অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। মানুষকে দ্রুত বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে গিয়ে যেনতেনভাবে লাইন টানা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রেই নিয়মকানুন মানা হয়নি। বরং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালীদের চাপে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দিয়ে লাইন টানা হয়েছে। দেশের শহরগুলোতেই পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা হাতেগোনা। আর গ্রামে বাড়িঘরগুলো খুবই অপরিকল্পিত। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। ফলে ওসব এলাকায় বিদ্যুতের লাইন টানা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তাসহ অলিগলি দিয়ে লাইন টানা হয়েছে। কারো বাড়ির জানালার পাশ দিয়ে, কারো বাড়ির গাছগাছালির ভেতর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলে গেছে বিদ্যুৎ লাইন। তারপর ওসব লাইন থেকে আবার বাঁশের খুঁটি দিয়ে তার নিয়ে অনেকেই বিদ্যুৎ চুরি করছে। যা খুবই ভয়ঙ্কর। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং পাহারা দেয়ার জন্য পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের লোকবল খুবই কম। সারাদেশে হাজার হাজার কিলোমিটার লাইন পাহারা দেয়ার মতো লোকবল তাদের নেই। ফলে গ্রামে এখন নতুন মৃত্যুফাঁদ ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুতের তার।
সূত্র আরো জানায়, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী। নকল ও মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদিতে সয়রাব বাজার। বিদ্যুতের তার, সুইচ বোর্ড, সার্কিটগুলো নিম্নমানের হওয়ায় বাসাবাড়িতে হরহামেশা শর্টসার্কিটের ঘটনা ঘটছে। তাতে আগুন লাগছে এবং গ্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলে অসতর্কতার কারণে বিদ্যুৎস্পর্শের ঘটনা বাড়ছে। আগামী ২০২০ সালের মধ্যে সারাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। ইতোমধ্যেই দেশের ৯৪ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা উদ্বৃত্ত। কিন্তু সরবরাহ লাইন না থাকায় বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া যাচ্ছে না। ওই কারণে বিতরণ লাইন সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতে করা হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন স্থাপনের আগে অনেকগুলো নিয়মকানুন পালন করতে হয়। এলাকা জরিপ করতে হয়। ওই এলাকায় কতজন গ্রাহক আছেন, বিদ্যুৎ দিলে আর্থিক লোকসান হবে কিনা, গ্রাহকদের আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি যাচাই-বাছাই করার পর সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য লাইন স্থাপনের অনুমোদন দেয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিয়মকানুন খাতা-কলমে থাকলেও সব ক্ষেত্রে প্রতিপালন করা হয় না। এলাকার রাজনৈতিক নেতা, এমপিসহ প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে কোনো রকম যাচাইবাছাই ছাড়াই বহু গ্রামে লাইন স্থাপন করা হয়েছে। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হলেও লাইন টানা হচ্ছে। ওসব কারণেই বিদ্যুৎস্পর্শে অকাল মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিদ্যুৎ লাইন টানার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন না করলে ভবিষ্যতে এভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে কিছু অসাধু মানুষ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তারা বিভিন্ন স্থানে বাঁশ দিয়ে লাইন নিচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে একটু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। তাতে মৃত্যুও পাশাপাশি অঙ্গহানিও ঘটছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় আহত ১৭ হাজার ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০১৬ সালে ওই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজারের ওপরে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মতে, দেশে অগ্নিকা-ের অধিকাংশ ঘটনাই বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সেজন্য ভবন তৈরিতে অনিয়ম, বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ এবং নকল ও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহারকে দায়ি করেছেন।
এ বিষয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শফিক উদ্দিন জানান, বিতরণ লাইনের দুর্বলতা শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামে বেশি দেখা যায়। তাই বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনাগুলো গ্রামেই বেশি ঘটে। তবে ওজোপাডিকোর আওতাধীন এলাকায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার পরিমাণ কমে আসছে। জরাজীর্ণ লাইন প্রতিস্থাপনের কাজ চলছে। তাতে আগামীতে বিতরণ ব্যবস্থা আরো নিরাপদ হবে।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা রোধে বিতরণ কোম্পানি ও গ্রাহক উভয়কে সচেতন হতে হবে। দ্রুত সংযোগ দিতে গিয়ে অনেক বিতরণ কোম্পানি লাইন স্থাপনে নিরাপত্তার দিকে কম নজর দিচ্ছে। আবার গ্রাহকরাও সচেতন কম। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকার বিদ্যুতের বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে। সচেতনতা বাড়াতেও কাজ চলছে। স্মার্ট গ্রিড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা দুর্ঘটনা রোধে সহায়ক হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *