মাধ্যমিক স্তরে অর্ধেক শিক্ষকই সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন না

এক্সক্লুসিভ: দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় বিগত ২০০৮ সালে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। সেজন্য প্রায় সব শিক্ষককেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু চালুর এক দশক পরও সৃজনশীল পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকই প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছে না। বলতে গেলে সৃজনশীল পদ্ধতির সাথে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকই এখন পর্যন্ত মানিয়ে নিতে পারেনি।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষকরাই যেখানে সৃজনশীল পদ্ধতি ভালোভাবে বুঝতে পারছে না, সেখানে শিক্ষার্থীদের বোঝার তো প্রশ্নই আসে না। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে ওসব বিষয় ভালোভাবে রপ্ত করতে না পারায় আগের তুলনায় শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন এবং সহায়ক বইয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মাউশির একাডেমিক সুপারভিশন দল চলতি বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৪ হাজার ৮০১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। তাতে দেখা যায় ২ হাজার ৭৫০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারছে। ওই হিসাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরিতে সক্ষম ৫৭ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাকি ৪৩ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ওই পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারছে না। তার মধ্যে ১ হাজার ২৬১টির শিক্ষকরা প্রশ্ন প্রণয়নে অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তা নিচ্ছে। আর বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিচ্ছে ৭৯০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাছাড়া বিগত ২০১৭ সালে মাউশির পরিদর্শক দল ৬ হাজার ৪৪২টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছিল। তার মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে সক্ষম ছিলেন। আর বাকি ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়কে অন্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় বা বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করতে হয়। তার আগে ২০১৬ সালে শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পৃশ্ন প্রণয়ন করতে পারতো না এমন বিদ্যালয় ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ।

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৭ সালে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ২০ হাজার ৪৬৭টি। ওসব বিদ্যালয়ে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকের সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজারেরও বেশি। আর শিক্ষার্থী ১ কোটি ৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৯৫ জন। কিন্তু ওসব বিদ্যালয়ের বড় অংশকেই সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এজন অদক্ষতা নয়, বরং পাঠদানে অতিরিক্ত চাপকেই দায়ি করছে শিক্ষকরা। তাদের মতে, সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে শিক্ষকদের বাড়তি পরিশ্রম রয়েছে। সেজন্য অধিকাংশ শিক্ষকই প্রশ্ন তৈরি করতে চান না। আবার প্রশ্ন প্রণয়নে সময় দিতে গেলে পাঠদানে মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন তৈরি করতে শিক্ষকদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ফি আদায় করা হয়, তা দিয়ে প্রশ্ন প্রণয়নের কাজ সম্পন্নও সম্ভব হয় না। ওসব কারণেই শিক্ষকদের বাইরের প্রশ্নের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এদিকে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ধারণা ছিল, সৃজনশীল পদ্ধতি কোচিং-প্রাইভেট বা সহায়ক বইয়ের ওপর নির্ভরতা কমবে। কিন্তু ঘটছে তার উল্টো। কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর তার নির্ভরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। কারণ যে কাঠামোয় এ শিক্ষাদান পদ্ধতি পরিচালনা করা হচ্ছে শিক্ষকদের পাশাপাশি অনেক অভিভাবকই জানেন না। বাধ্য হয়েই এ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞ শিক্ষকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে মাধ্যমিকের সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান জানান, সৃজনশীল প্রশ্নের ক্ষেত্রে দুটি দিক রয়েছে। একটি ডেভেলপিং বা প্রশ্ন প্রণয়ন। অন্যটি মার্কিং বা নম্বর দেয়া। কিন্তু তার কোনোটিই শিক্ষকরা সঠিকভাবে করতে পারছেন না।

বিশেষ করে প্রশ্ন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেশ অনাগ্রহ রয়েছে। সেজন্য মূলত সমিতির মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের সহজলভ্যতাই দায়ী। আবার যারা প্রশ্ন তৈরি করছেন, তারাও ঠিকমতো তা করতে পারছেন না। বইয়ে দেয়া উদাহরণ হুবহু প্রশ্নে তুলে দেয়া হচ্ছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা যাচাইয়ের সুযোগ নেই। তাছাড়া নম্বর দেয়ার কাজটিও শিক্ষকরা সঠিকভাবে করতে পারছে না। সৃজনশীলের সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে বেশির ভাগ শিক্ষকই ইচ্ছামতো নম্বর দিচ্ছে।

সৃজনশীল বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নের উত্তরে জানান, বিভিন্ন বিষয়ের শ্রেণি শিক্ষককে সৃজনশীল পদ্ধতিতে দক্ষ করার লক্ষ্যে সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইএসডিপি) ও সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের (সেসিপ) অধীনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

তাছাড়া সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষকদের বর্ধিত পরিসরে প্রশিক্ষণের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় সেসিপের প্রোগ্রামে দলিলের বরাদ্দের আওতায় ৩ দিনের প্রশিক্ষণের পরিবর্তে ৬ দিনের টওাশক্ষণ আয়োজনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৩ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ১ হাজার ৬৯২ জনকে ১২ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে মাস্টার ট্রেইনার পুল প্রস্তুত করা হয়েছে। আরো ১ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া বিএড প্রশিক্ষণে সৃজনশীল বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে বিষয়টি কোর্স প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *