মুশফিক, লারার জন্মদিন পালন করতেন

স্পোর্টস: বাসার সবাই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ভক্ত। বাসার ছোট ছেলেটিরও অভ্যাস হয়ে গেল রাত জেগে খেলা দেখার। বিশেষ করে, একজন ব্যাটিংয়ে নামলে যেন চোখের পলক পড়ত না ছেলেটির। বগুড়ায় নানির বাসায় বসে হাজার মাইল দূরে ক্যারিবিয়ান রাজপুত্রের ব্যাটিং টিভিতে দেখে প্রাইমারি পড়ুয়া ছেলেটি ছুটোছুটি করত নিজের স্বপ্নের ২২ গজে! এভাবেই ব্রায়ান লারাকে দেখে ক্রিকেট স্বপ্নের পেছনে ছুটতে শুরু করেছিলেন বগুড়ার ছোট্ট মিতু, সময়ের পরিক্রমায় এখন যিনি মুশফিকুর রহিম নামে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনায়। বাংলাদেশের ক্রিকেটে যারা এখনকার তারকা, বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে তাদের জীবনেও ছিল অনেক তারকা।

মুশফিকের কাছে নায়ক মানেই লারা! বাংলাদেশের ক্রিকেট আকাশে উজ্জ্বল এক তারকা মুশফিক। কিন্তু তার নিজের কাছে এখনও সবচেয়ে বড় তারকা লারা। পাঁড় ভক্ত বলতে যা বোঝায়, মুশফিক ছিলেন তেমনই। এমনকি তার ছেলেবেলায় লারার জন্মদিনও পালন করেছেন তারা! জীবনের ইনিংসে লারার ৫১ বছর পূর্ণ হলো শনিবার। প্রিয় তারকার জন্মদিনে মুশফিক শোনালেন ক্যারিবিয়ার কিংবদন্তির প্রতি অনুরাগের গল্প।
‘শুরু থেকে শেষ, কেবলই লারা’

“আমার কাছে ছেলেবেলা থেকেই তারকা মানে লারা। ভালোভাবে কিছু বুঝে ওঠার আগে থেকেই শুরু হয়েছে ভালো লাগা। বুঝতে শেখার পর থেকে তার প্রতি ভালোবাসা কেবল বেড়েছেই।” “শুরুটা ছিল বাসার সবাইকে দেখে। আমার বড় ভাই, মেজো আপু, সবাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সমর্থক ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলা শুরু হতো বাংলাদেশ সময় রাত ৭টা-৮টায়। রাত জেগে খেলা দেখা হতো আমাদের বাসায়। আমিও ছোটবেলা থেকে দেখতাম, যতক্ষন জেগে থাকতে পারতাম।” “অনেক সময়ই আমাদের বাসায় আমাকে বলত ঘুমিয়ে পড়তে, নাহলে সকালে স্কুল কামাই করতে পারি। আমার ইচ্ছে করত না ঘুমাতে। এজন্য নানির বাসায় চলে যেতাম। আমাদের বাসা থেকে স্কুলের পথেই ছিল নানির বাসা। এমন অনেক হয়েছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা থাকলে ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে নানির বাসায় চলে যেতাম। ওখানে কেউ আমাকে বাধা দিত না। অনেক রাত পর্যন্ত খেলা দেখে পরদিন স্কুলে যেতাম।” “খেলা দেখা বলতে, অপেক্ষা করতাম লারার ব্যাটিংয়ের জন্য।

বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচে। আমার তখন থেকেই টেস্ট ভালো লাগত। লারা অনেক সময় ব্যাট করবেন, হয়তো এ কারণেই!” “রাতে লারার খেলা দেখতাম। দিনে তার মত খেলতে চাইতাম। যদিও তিনি বাঁহাতি, আমি ডানহাতি। তবু তার মত খেলার ইচ্ছে হতো। ওরকম চেষ্টা করতাম। আয়নার সামনে ব্যাটিং করতাম, তাহলে উল্টো দেখা যেত। দেখতাম, বাঁহাতি ব্যাটিং করলে কেমন লাগে, শট খেললে আমাকে লারার মতো দেখায় কিনা।” “বাসার সবাই লারার খুব ভক্ত ছিল। এমনকি লারার জন্মদিনও পালন করেছি আমরা। খুব বড় কিছু নয়, নিজেরা মজা করে করেছি। এতটাই পাগল ভক্ত ছিলাম।” “তার খেলার সৌন্দর্য খুব ভালো লাগত। কী দারুণ স্টাইলিশ ছিলেন! তার পর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি, বিকেএসপিতে গেলাম, বয়সভিত্তিক খেলতে শুরু করলাম, তখন লারার আরও বড় ভক্ত হয়ে উঠলাম। সময়ের সঙ্গে বুঝেছি, আমি কত বড় একজন ব্যাটসম্যানকে ছোট থেকে পছন্দ করি! আমার আদর্শ ছিলেন লারা।”

“১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার সেই ১৫৩ রানের ইনিংসটিও দেখেছিলাম। পরে ভিডিও দেখেছি অনেকবার। ইনিংস তো নয়, যেন ব্যাটসম্যানশিপের শিক্ষা। স্কিল, টেম্পারমেন্ট, মানসিক শক্তি সব কিছু মিলিয়ে অসাধারণ ছিল সেটি।” “২০০৭ বিশ্বকাপে গিয়ে আমার স্বপ্নের তারকার সঙ্গে দেখা হলো। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে অফিসিয়াল ডিনার ছিল। সেখানে প্রথম দেখলাম। তবে তখন কথা বলার সুযোগ হয়নি। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। ফটো সেশনসহ অনেক ব্যস্ততা ছিল। তার কাছে গিয়ে কথা বলতে পারিনি।”

“সুযোগ এলো টুর্নামেন্টের শেষ দিকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে আমাদের খেলা ছিল বারবাডোজে। আমাদের রফিক ভাইয়ের (সাবেক স্পিনার মোহাম্মদ রফিক) সঙ্গে লারার দেখি অনেক খাতির। রফিক ভাইকে বললাম, লারার সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে। রফিক ভাই নিয়ে গেল তার কাছে। লারা বললেন, রাতে যেন হোটেলে দেখা করি।” “রাতে রফিক ভাইকে নিয়ে গেলাম তার রুমে। বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। আমি নিজেই তখন জাতীয় দলে খেলছি, বিশ্বকাপ খেলছি, তবু যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, সত্যিই লারার সঙ্গে কথা বলছি!” “লারাকে বলেছিলাম যে আপনি ছেলেবেলা থেকে আমার আইডল। চারটা ব্যাট নিয়ে গিয়েছিলাম, সবকটাতে অটোগ্রাফ নিয়েছি। কথা বলতে থাকলেও শুরুর দিকে আমার আসলে কানে কিছু ঢুকছিল না। আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম।”

“এরপর ২০১২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে আমরা ত্রিনিদাদে একটা তিন জাতির সিরিজ খেলতে গিয়েছিলাম। সেখানে হোটেলে দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। কথাও হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “আমি তোমার খেলা দেখেছি।”

আমার খুব ভালো লেগেছিল। বিপিএলে এলেন চিটাগংয়ের পরামর্শক হয়ে, তখনও কথা হয়েছে।” “আগের সেই আবেগ অবশ্যই কমছে আস্তে আস্তে বয়সের সঙ্গে। তবে তার প্রতি ভালো লাগার কমতি নেই। লারা এখনও আমার নায়ক।”

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *