রমজানে পরিবারের সঙ্গে মহানবী (সা.)

ধর্মপাতা: মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ: রমজান মাসে রাসুল (সা.)-এর পারিবারিক জীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন থাকত, তাঁর মহান স্ত্রী উম্মুল মুমিনদের জীবনধারাও বদলে যেত এই মাসে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে মগ্ন হতেন নবী পরিবারের প্রতিটি সদস্য। রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর-পরিবারের সিয়াম সাধনার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:রোজার বিধি-বিধান শিক্ষা

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রী-পরিবারকে রমজানে রোজার বিধি-বিধান শিক্ষা দিতেন। মুআজা বিনতে আবদুল্লাহ আদাবিয়াহ (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করি, ঋতু¯্রাবের সময়ে নারী রোজার কাজা করবেন, অথচ নামাজের কাজা করবেন না? আয়েশা (রা.) বললেন, তুমি কি হারুরি তথা খারেজি সম্প্রদায়ের কেউ? আমি বললাম, না; বরং আমি এমনিতেই জানতে চাচ্ছি। তিনি বললেন, আমরাও এ সমস্যায় পড়তাম। তখন আমাদের রোজার কাজা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নামাজের কাজা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।’

দান-দক্ষিণা ও সহযোগিতারাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে সবাই কল্যাণমূলক যেকোনো কাজে সচেষ্ট থাকতেন। তবে দান ও অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতেন জায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.)। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুল (সা.)-এর কাছে মর্যাদার দিক থেকে আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত জায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.)। জায়নাবের চেয়ে অধিক দ্বিনদার কোনো নারী আমি দেখিনি। খোদাভীতি, সত্যবাদিতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন ও দান করার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতেন তিনি। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও সদকার আমলের ক্ষেত্রে তিনি খুবই নিবেদিত হতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৪৪২)
রাতের ইবাদতে পরিবারের অংশগ্রহণ

রাসুল (সা.) রমজানে অধিক পরিমাণ ইবাদত করতেন। এই সময় পরিবারের সবাইকে ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। রমজানের শেষ ১০ দিন অবশিষ্ট থাকাকালে রাসুল (সা.) নামাজ পড়তে সক্ষম এমন সবাইকে নামাজে দাঁড় করিয়ে দিতেন। (ফাতহুল বারি : ৪/৩১৬)
শেষ দশকের রাতে পরিবারকে জাগিয়ে তোলা

রমজানের রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও অন্যান্য আমল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রমজানের শেষ দিন এলে রাসুল (সা.) শক্তভাবে কোমর বেঁধে নিতেন। পুরো রাত জেগে থাকতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২৪)
লাইলাতুল কদরে পঠিত দোয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা

আয়েশা (রা.) ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিধি-বিধান সম্পর্কে জেনে সবাইকে জানাতেন। তেমনি তিনি লাইলাতুল কদরের মর্যাদা জেনে এই রাতে পঠিত দোয়া সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করেছেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে অবগত হলে আমি কী দোয়া করব? রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি পড়বে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৫৩৪)

পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষায় ইতিকাফ ত্যাগরাসুল (সা.) সব সময় পরিবারের মধ্যে সাম্য-সম্প্রীতিবোধ বজায় রাখতেন। প্রয়োজনে তিনি নফল ইবাদতও ত্যাগ করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। আমি তাঁর জন্য তাঁবু টানিয়ে দিই। ফজরের নামাজের পর তিনি তাতে থাকতেন। হাফসা (রা.) এসে আয়েশা (রা.)-এর কাছে আরো একটি তাঁবু স্থাপনের অনুমতি চাইল। আয়েশা (রা.) অনুমতি দেন। এমনটি দেখে জায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.)-ও একটি তাঁবু স্থাপন করলেন। ভোরবেলা রাসুল (সা.) এতগুলো তাঁবু দেখে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সব কিছু জেনে তিনি বললেন, এগুলো দিয়ে কি তোমরা পুণ্যের আশা করছ? অতঃপর তিনি এই মাসে আর ইতিকাফ করলেন না। পরবর্তী মাস শাওয়ালে তিনি ইতিকাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯২৮)
তারাবিতে অংশগ্রহণ

আবু জর (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘আমরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে রোজা রেখেছি। তিনি আমাদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেননি। মাসে আর সাত দিন অবশিষ্ট। অতঃপর তিনি আমাদের নিয়ে রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামাজ আদায় করেন। অতঃপর ষষ্ঠ দিনও আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করেননি। অতঃপর পঞ্চম দিন আবার আমাদের নিয়ে রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নামাজ আদায় করেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমাদের জন্য বাকি রাত নফল করে দিন। তিনি বললেন, যে ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত নামাজ পড়বে সে পুরো রাত নামাজ আদায়ের সওয়াব পাবে। অতঃপর তিনি আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করলেন না। মাসের আর তিন দিন অবশিষ্ট। তৃতীয় দিন তিনি আমাদের নিয়ে নামাজ পড়লেন। তখন তাঁর পরিবার ও স্ত্রীদেরও ডাকলেন। আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করলেন। আমরা সাহরির সময় শেষ হওয়ার আশঙ্কা করলাম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮০৬)
শিশুদের রোজা রাখতে অভ্যস্ত করা

রাসুল (সা.)-এর যুগ থেকে মুসলিম নারীরা শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করতে সচেষ্ট ছিল। রুবাইয়ি বিনতে মুআওয়াজ বিন আফরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আশুরার দিন সকালে আনসারদের এলাকায় রাসুল (সা.) একজন দূত পাঠিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা সকাল থেকে না খেয়ে আছ তারা রোজাকে পূর্ণ করবে। অতঃপর আমরা রোজা রাখি এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতে চেষ্টা করি। শিশুদের জন্য আমরা পশমের খেলনাসামগ্রী তৈরি করি। কেউ কান্না করলে

আমরা তাকে খেলনা দিতাম। ইফতারের সময় পর্যন্ত তার কাছে তা থাকত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৭৭)
ইতিকাফে স্ত্রীর সাক্ষাৎইতিকাফ অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে স্ত্রী এসে সাক্ষাৎ করতেন। হাসান বিন আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা সফিয়া বিন হুয়াই (রা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কথা বলে ফিরে যেতে উদ্যত হন। তখন রাসুলও তাঁকে এগিয়ে দিতে আসেন। উম্মে সালামার গৃহসংলগ্ন মসজিদের দরজার কাছে পৌঁছলে দুজন আনসারি রাসুলকে সালাম দেন। তখন তিনি তাদের বললেন, তোমরা চলতে থাকো। ইনি সফিয়্যাহ বিনতে হুআই (রা.)।

তারা দুজন বলল, হে আল্লাহর রাসুল, সুবহানাল্লাহ। তাদের বিষয়টি অন্য রকম মনে হলো। রাসুল (সা.) বললেন, ‘শয়তান আদম সন্তানের সঙ্গে রক্তের মতো অবস্থান করে। আমার মনে হয়েছে তোমাদের অন্তরে কোনো মন্দ কিছু এসেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৩৫)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *