রোহিঙ্গা সংকটে নতুন মোড়

রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ নির্ধারণের পরও কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো যায়নি। একটি রোহিঙ্গা পরিবারও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়নি। তারা দাবি করেছে, নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকারসহ মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশগুলো রোহিঙ্গাদের এ দাবিকেই সমর্থন করছে। জানা যায়, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত এনজিও ও বিদেশি কিছু সংস্থাও রোহিঙ্গাদের উসকানি দিচ্ছে ফেরত না যাওয়ার জন্য। কিন্তু রোহিঙ্গাদের এসব দাবি পূরণে মিয়ানমারকে বাধ্য করার মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। তাই এখন প্রশ্ন উঠছে, আগামি ১০০ বছরেও মিয়ানমার যদি এসব দাবি পূরণ না করে, তাহলে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কি এ দেশেই থেকে যাবে? অথবা পাশ্চাত্যের কোনো শক্তির কি বিশেষ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে?
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিতে (থার্ড কমিটি) গত শুক্রবার রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে আবারও নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এর আগেও এ কমিটিতে একই ধরনের একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল, যা পরে সাধারণ পরিষদের প্ল্যানারি সেশনে অনুমোদিত হয়েছিল। শুক্রবারের নিন্দা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ১৪২টি এবং আগের মতো চীন, রাশিয়াসহ ১০টি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ও ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই বিভক্ত অবস্থান থাকলে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব কি? বরং মিয়ানমার তার সুযোগ নেবে। এটা ঠিক, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আগে তাদের সেখানে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা প্রয়োজন। মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। বরং রাজনীতিই বেশি দেখা যাচ্ছে। বক্তব্য, বিবৃতি ও কিছু হুমকি-ধমকি ছাড়া কঠোর কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। এসব কারণে কোনো কোনো কূটনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বরং তাদের কিছুকিছু কর্মকা-ে এমনটাই মনে হয় যে কোনো কোনো শক্তি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে রেখে দিতেই আগ্রহী। যদি তা-ই হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য এক ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে। আমরা কি সেই ভয়ংকর পরিণতির জন্য অপেক্ষা করব?
বাংলাদেশ ছোট্ট একটি ভূখ-। এর নিজেরই রয়েছে জনসংখ্যার অস্বাভাবিক ঘনত্ব। অর্থনীতিও তেমন শক্তিশালী নয়। বেকারত্ব ক্রমবর্ধমান। তা সত্ত্বেও শুধু মানবিক বিবেচনা থেকে মিয়ানমারে নির্মম নির্যাতনের শিকার বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হয়েছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের প্রতিপালন করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল এই বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। আর এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা একেবারেই কাম্য নয়।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *