শব্দের প্রতিক্রিয়া–জেসমিন মুন্নী

এবং ক্রমশ একটি গরগর গোঙানিÑট্যাক্সির একটানা ভোঁ ভোঁ, রাস্তার যাবতীয় হর্ন, মানুষের চ্যাঁচামেচি, হরতাল, অবরোধ, জ¦ালাও-পোড়াও সবকিছু ভেদ করে সুদীপার কানের পর্দায় আঘাত। তারপর শব্দটা মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশ-বাতাস শহর ছাড়িয়ে দূরে বহুদূরে। গোঙাচ্ছিল তার উৎস সৃষ্টির ব্যক্তিটি। যার গভীর অন্ধকার গহ্বর জলের মধ্যে ভেসে একদিন আলোর উৎস খুঁজে পেয়ে কৃতজ্ঞ হাসি কান্নার ধ্বনি-রূপ পেয়েছিল। কিন্তু মুহূর্ত পূর্বে পরিকল্পিতভাবে যাকে হত্যা করা হলোÑতার অবস্থানও তো ছিল সেই একই উৎসে। সে কেন পেল না আলোর উৎস!
সুদীপা জানত সব কিছু। আশৈশব তার হৃদয়ের সিন্দুকে জমে থাকা সব কষ্টগুলোকে সে লালন করছিল। অতঃপর সুদীপা দেখেÑএকদলা রক্তপি-, রুগ্ণ ফ্যাকাশে মুখ, জীর্ণ ঊরু, তেইশ বছর ধরে চেনা ঘ্রাণ, তারপর নিখুঁত হাতে সম্পন্ন করেছিল কাজটি।
যেহেতু সুদীপা বাঁহাতে ধরে আছে শব্দের উৎস, অবচেতন নিষ্প্রাণ, যেহেতু সে জানে ব্যক্তিটি কে এবং বাবার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি এবং যেহেতু তার গৃহশিক্ষকের কাছে প্রতারিত এবং এসব কারণে সুদীপা এককভাবে কাউকে দায়ী করে না। তাই একভাবে বিরক্তিকর গরগর শব্দে বিরক্তি হয় না। বরং অনুভব করে সোমত্ত মেয়ের কাছে একজন অসহায় মায়ের নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ। তারপর দেখে ক্ষণিকের জন্য প্রবল হওয়া ঠোঁটের কোণে নিজের সৃষ্টির কাছে হেরে যাওয়া বেদনাতুর একখান মুখচ্ছবি।
অন্ধকারের শব্দ সেদিন শীৎকারে রূপ নিয়েছিল। অন্ধকার দেখেছিল তার গৃহশিক্ষকের চোখে। অন্ধকার এবং শীৎকার।
মাত্র মাসখানেক আগের ঘটনা হবে। সিলেট মেডিকেলে তখন সুদীপা সবে মাত্র ফাইনাল শেষ করে ইন্টার্নশিপ করেছে। ডে-নাইট মিলিয়ে মহা ব্যস্ততার মধ্যে তার সময় পার হচ্ছিল। ক্রমশ হাতযশও ছড়িয়ে পড়ছে। এরইমধ্যে ঘটনার সূত্রপাত টের পেয়ে কোনো প্রকার প্রশ্নের সম্মুখীন না হয়ে প্রাথমিক পর্যায় ওষুধের কাজ হবে ভেবে সে ওষুধ প্রয়োগ করেছিল। সপ্তাহ খানেক অপেক্ষা করে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে অবশেষে এই অবচেতন নিষ্প্রাণ এনেসথেসিয়ার প্রতিক্রিয়া। লোক-লজ্জার ভয়ে যেনতেন একটা ক্লিনিকে কাজটি করতে গেলে মার শুষ্কমুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। চেতনানাশক ওষুধ দেবার পরে মা অস্পষ্টভাবে একটা নাম উচ্চারণ করলেও সুদীপার কানে সেটা পৌঁছয় নি। সুদীপা টের পাচ্ছিল মার হৃদয়ের কম্পন মাংসপেশির মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছিল। রক্তপি-টি আঁকড়ে ছিল জরায়ুর বাম অংশে। প্রচ- রক্তক্ষরণেও সেটি টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল সুদীপার কৌশলের কাছে। সেদিন পরিস্থিতি মার অনুকূলে থাকলেও সুদীপা শেষবারের মতো মার দীর্ঘশ্বাসটুকু ঠিকই টের পেয়েছিল। মা কী চেয়েছিল অঙ্কুরিত চারাটি একটি গাছে পরিণত হোক! মাকে সুদীপার প্রতিবারের মতো আরো অদ্ভুত লাগে। যেমন লাগত ছোট বেলায়।
বছর কয়েক পূর্বে যখন এরূপ অবস্থান ছিল না তখন তারা ছিল একত্রে। মা-বাবা, সুদীপা এবং সরকারি কলোনিতে তাদের বিশাল কোয়ার্টার। পিছনে মাঠ পেরিয়ে রাস্তার মাথায় মিষ্টি হাওয়াদের গোল্লাছুট। প্রাচীন বৃক্ষ, প্রাগৈতিহাসিক পাহাড়, ঐতিহাসিক চা বাগান, আকাশের ক্যানভাসে মেঘেদের শৈল্পিক চিত্র, মায়ের নিপুণ হাতে শীতের সকালে ধূমায়িত পিঠা। অসাধারণ! প্রতিদিন বাবার হাত ধরে মাঠের মধ্যে ঘাসেদের মাড়িয়ে হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে দল বেধে খেলাÑসুলতানা বিবিয়ানা সাহেব বাবুর বৈঠকখানা, সাহেব বলেছে যেতে পান-সুপারি খেতেৃ।’ কলোনির রাস্তায় দাগ কেটে কুতকুত খেলার সঙ্গে ঘর কিনে রাস্তায় অলংকরণ করা। মধ্যাহ্ন তাপের নিচে ভাঙা চুড়ি কুড়াতে যেয়ে মার কাছে বকা খেয়ে বাবার পেছনে মুখ লুকান। সবই কত মধুর! ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে সারারাত জেগে মা-বাবাসহ কলোনির সবার সঙ্গে শহিদ মিনার নির্মাণ। রাতে সবার বাগান থেকে ফুল চুরি করে প্রভাত ফেরিতে ফুল দেয়া। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৬ই ডিসেম্বর ক্যাসেট প্লেয়ারে রক্ত গরম করা বিজয়ের গান, ওঠো মুমিন রোজা রাখো রমজানেরই রোজা রাখোৃ রমজান মাসে কলোনির ছেলেদের সম্মিলিতভাবে ঘুম জাগানিয়ার গান, দুর্গাপূজার সময় চাঁদা তুলে ম-প সাজিয়ে নবমীর রাতে রাতভর ঢোলের শব্দে বাবার বন্ধুদের উম্মাদ নৃত্য; সব কিছুর সম্মিলিত সুর তার মস্তিষ্কে এখনও প্রখর। সবচে মজার ছিল পিকনিকের সেইসব দিন। প্রতি বছর মার নেতৃত্বে কলোনির সবাই মিলে সিলেটের সব পিকনিকের স্পটগুলো ছিল সুদীপার পাঠ্য বইয়ের মতো মুখস্থ। প্রতিটা পূর্ণিমার চাঁদে মা উন্মুক্ত ছাদে আয়োজন করত রবীন্দ্র সংগীতের আসর। বাবার গলায় ‘আমার পরান যাহা চায়ৃ’ গানটি না শোনা পর্যন্ত মা ঘরে ফিরত না। সুদীপার শৈশব জীবনে কলোনিতে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি ঘটনা প্রত্যেকটি মধুর শব্দ তার ভাবনাগুলোকে সমৃদ্ধ করেছিল।
সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত বাবা-মার মধুর সোহাগের দৃশ্য। তখন সুদীপার সব ছিল। মার অকারণ খিলখিল হাসি উপচে পড়া নদীর জলের মতো ছলাৎ ছলাৎ করত। কেননা তখন বাবা-মা ছিল গভীর আবেগে নিমজ্জিত। জ্যোৎস্না রাতে ভিজে, বৃষ্টি রাতে বেলি ফুলের ঘ্রাণে, শরতের শিশির মাড়িয়ে, শীতের নরম রোদে, ধূমায়িত চায়ের চুমুকে সুখগুলো তাদের গদগদ ছিল। তাই সুদীপার উত্তরোত্তর উত্তরণ ঘটেছিল। পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে সে প্রবাহিত ছিল দূরের সমুদ্রের দিকে। জলের মতো স্বচ্ছ ছিল ভাবনাগুলো। দুঃখ ছিল সাত সমুদ্র তের নদী তারও ওপারের অন্য কেউ। তখন সে ছিল আলোয় উদ্ভাসিত। আলোর ভিতর গহিন আলোয়। সুদীপা যেহেতু তখন আলোয় ছিল সেহেতু অন্ধকারকে প্রথম দেখে অপরিচিত আত্মীয়কে দেখার মতো চমকে উঠেছিল। কেননা এত উঁচুতে তার স্বপ্ন উড়েছিল যে ভবিষ্যৎ টের পেয়েছিল হয়তো। কিন্তু আলোর অবস্থানের মধ্যে নিজের অবস্থান বুঝে নেবার ক্ষমতা তখনও জন্মায় নি। তখনও সে বুঝতে পারে নি কী বিপদ তার জন্য অপেক্ষা করে ছিল! একদিন আলো তার গোপনীয়তার পর্দা ছিঁড়ে প্রকাশিত হলো। সেদিন অন্ধকারের বিকট আওয়াজ এসেছিল তার মায়ের কক্ষ থেকে। অন্ধকারের শব্দ সেদিন শীৎকারে রূপ নিয়েছিল। অন্ধকার দেখেছিল তার গৃহশিক্ষকের চোখে। অন্ধকার এবং শীৎকার। শিক্ষক এবং মা। সুদীপা এবং অন্ধকার।.. এবং সকলেরই একটি চক্রাকার কু-লী হয়ে একটি মিলিত শব্দের অনুসৃষ্টি। আহ! আহ! ৃ
সুদীপার কানে গরগর শব্দটি প্রকট থেকে প্রকটতর। আহ! আহ! উহ! উহ! তারপর যাবতীয় শব্দের একটি মিলিত ধ্বনিরূপ গরগর গরগর।
অতঃপর চক্রাকার শব্দের মাঝে সুদীপার চিন্তাশক্তি ঘোরে। একসময় সবকিছু ওর বিপক্ষে কাজ করছিল। সেই চরম পরিস্থিতি তার জন্য ছিল অসহনীয়। সহ্য ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। বাবা-মার বিচ্ছেদ, নানা বাড়িতে মার প্রত্যাবর্তন, মার নতুন নতুন সম্পর্কের সূত্রপাত, তার স্বচ্ছ চিন্তাশক্তির মাঝে সন্দেহের জলীয়বাষ্পের আস্তরণ। কলেজ থেকে নানাবাড়ি ফিরে সয়ে যাওয়া গৃহশিক্ষকের উপস্থিতি দেখে অনঅভ্যস্ত চোখ। মার ভাষ্য অনুযায়ী তারা সবাই ছিল সম্পর্কে মামা। এবং প্রতিদিনই আরও অনেক মামা। অভ্যেস পুরো ব্যাপারটাকে সুদীপার কাছে সহজ করে দিয়েছিল। যেহেতু তার মামারা স্বভাবে সংযত ছিল। সেহেতু শিকারির উপর এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে না পড়ে তারা সুষ্ঠ আচরণ করত।
ততদিনে সুদীপার চোখের জল ক্রমে কুয়াশায় পরিণত। সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিল নিজেকে। কেননা সুদীপা জেনেছিল যেখানে যত বেশি বিকল্প ব্যবস্থা সেখানটা ততবেশি আধুনিক। সে আধুনিক। তার মা আধুনিক। বাবা আধুনিক। মামারা আধুনিক। যেহেতু তারা সবাই আধুনিক, তার সমাজ আধুনিক। যেহেতু তার বাবা বিয়ে করেছিল তারই বয়সী এক মেয়েকে, সেহেতু সে তার মায়ের এই ঘটনায় কম্পিত হয় নি। কেননা আধুনিক সমাজে আছে চমকে দেবার মতো ক্ষমতা। বরং আংশিক অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে, মা কেন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে নি।ৃএবং সে এটা ভেবেও চমকিত হয় না যে তার শিক্ষক মামা ছয় মাস আগে বিয়ে করে ঢাকায় চলে গিয়েছিল এবং তিন মাস পূর্বে তারই বাগদত্তা ডাক্তার সাব্বির সিলেট মেডিকেলে একটা কাজ নিয়ে এলে সপ্তাহখানেকের জন্য তার নানাবাড়িতে অবস্থান করেছিল।
সুদীপার কানে গরগর শব্দটি প্রকট থেকে প্রকটতর। আহ! আহ! উহ! উহ! তারপর যাবতীয় শব্দের একটি মিলিত ধ্বনিরূপ গরগর গরগর। গরগরৃ এবং ক্রমশ একটি গরগর গোঙানি-ট্যাক্সির একটানা ভোঁ ভোঁ, রাস্তার যাবতীয় হর্ন, মানুষের চেঁচামেচি, হরতাল, অবরোধ, জ¦ালাও-পোড়াও সবকিছু ভেদ করে সুদীপার কানের পর্দায় আঘাত। তারপর শব্দটা মিলিয়ে যাচ্ছে আকাশ বাতাস শহর ছাড়িয়ে দূরে বহুদূরে..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *