শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু ১২ সেপ্টেম্বর থেকে

এফএনএস: আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গতকাল রোববার শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভাশেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী গণমাধ্যমকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, দেশে করোনার সংক্রমণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। জুলাই মাসের তুলনায় সংক্রমণ ৭০ শতাংশ কমেছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে। প্রথম দিন চার-পাঁচ ঘণ্টা ক্লাস হবে। পর্যায়ক্রমে এই ক্লাসের সংখ্যা বাড়বে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ সবাইকে মাস্ক পরিধান করতে হবে। ডা. দীপু মনি বলেন, শুরুর দিকে ২০২১ সালে যারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাদের প্রতিদিন স্কুলে আসতে হবে। এছাড়াও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্লাসে আসবে। তিনি বলেন, স্কুলে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করাতে হবে। স্কুলে আপাতত কোনো অ্যাসেম্বলি হবে না। তবে ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বা খেলাধুলা চলবে, যাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে চেকলিস্ট পূরণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং করে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস চলাকালে কী কী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সে সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। অভিভাবকরা যখন তাদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাবেন তখন তার পরিবারের কেউ কিংবা শিক্ষার্থীর করোনার উপসর্গ নেই তা নিশ্চিত করবেন। তার সন্তানের মাধ্যমে যেন অন্য কোনো শিক্ষার্থী সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে সে ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসবে তখন করোনা সম্পর্কিত যত ধরনের গাইডলাইন, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) যা যা হালনাগাদ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে শিক্ষক ও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিদিনের শারীরিক তাপমাত্রা মাপা, কারও কোনো উপসর্গ আছে কি-না তা পরীক্ষা করা এবং শ্রেণিকক্ষে সবার মুখে মাস্ক পরা আছে কি-না তা নিয়মিত পরীক্ষা করবেন। মাস্ক ছাড়া কাউকে ক্লাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মুখে মাস্ক পরিয়ে ক্লাসে পাঠাবেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অভিভাবকরা তারা তাদের সন্তানদের মাস্ক দিয়ে দেবেন, যেন শিক্ষার্থীরা বাসা থেকেই মাস্ক পরে স্কুলে আসে। তারা বাসায় ফিরে যাওয়া পর্যন্ত যেন মাস্ক পরে থাকে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন শিক্ষার্থীরা আসবেন যত ধরনের গাইডলাইন, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) যা যা আমরা হালনাগাদ করেছি, সেগুলোর ভিত্তিতে শিক্ষকরা, সেখান ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা সবাই তা নিশ্চিত করবেন। প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর তাপমাত্রা মাপা এবং তাদের অন্যান্য উপসর্গ আছে কি-না সেটি চেক করতে হবে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবশ্যই সবার মাস্ক পরতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, খুব ছোট বা কম বয়সী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা খেয়াল রাখবেন, যাতে কারো অসুবিধা হয় কি-না। মাস্কের কারণে কোনো শিক্ষার্থীর অসুবিধা হয় কি-না। সেই বিষয়গুলো শিক্ষকরা অবশ্যই দেখবেন। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী তো (মাস্কের) সমস্যা হলে নিজেই বলতে পারবে। কিন্তু ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভের বাচ্চা নিজে নাও বলার মতো অবস্থায় থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে শিক্ষকরা সেদিকে নজর রাখবেন। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর ও গাইডলাইনের মধ্যে এই বিষয়গুলো থাকবে।
১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীরাও টিকা পাবে: টিকা প্রাপ্তি সাপেক্ষে ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের পর্যায়ক্রমে অবশ্যই টিকা দেওয়া হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগেই বলেছেন, ১৮ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে টিকা দিতে। সে কার্যক্রম চলছে। আমরা যেন ১২ বছরের বেশি বয়সীদেরও ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসতে পারি, সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ১২ বছরের অধিক বয়সীদের সব ধরনের টিকা দেওয়া যায় না। যে টিকাগুলো দেয়া যায়, সেগুলো কিছু নিয়ে আসা হয়েছে, আরও নিয়ে আসা হবে। সেগুলো প্রয়োগের জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়। সে প্রস্তুতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিচ্ছে। আমরা সহসাই সে কার্যক্রম শুরু করবো। টিকাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে ১২ বছরের অধিক বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা পর্যায়ক্রমে অবশ্যই দেবো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত সাত কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিকা পাননি, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা দেয়া যখন শুরু হয়েছে, এর মধ্যে যাদের এনআইডি আছে তাদের রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়েছে। তারা কি পাবলিক, প্রাইভেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি সাত কলেজের শিক্ষার্থী, সেটি দেখা হয়নি। কাজেই যেকোনো শিক্ষার্থীর বয়স যদি ১৮ বছরের বেশি হয় এবং তার এনআইডি থাকে, এখনই সে টিকা পেতে রেজিস্ট্রেশন করতে পারে। এখনই সে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা নিতে পারে। যার এনআইডি নেই, তার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অক্টোবরের আগে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে ভিসিদের সঙ্গে বৈঠক: অক্টোবরের আগে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চলতি সপ্তাহে ভিসিদের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সঙ্গে আমরা একটি সভা করেছিলাম গত মাসের শেষে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ আবাসিক শিক্ষার্থীকে টিকা দিয়ে দিতে পেরেছি। যারা অনাবাসিক তাদের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। যাদের এনআইডি আছে তাদের তো সমস্যা নেই। যাদের এনআইডি নেই তাদেরও দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিসিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল যে, অন্ততপক্ষে সব শিক্ষার্থী এক ডোজ টিকা নেওয়ার পরে দুই সপ্তাহ সময় দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার। সেটার আলোকে মধ্য অক্টোবর ঠিক করা হয়েছিল। এখন যে পরিস্থিতি তাতে আমি আবারও এই সপ্তাহে উপাচার্যদের সঙ্গে হয়তো বৈঠক করবো ইনশাল্লাহ। সেখানে অবস্থা আবারও পর্যবেক্ষণ করে যদি তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা অক্টোবরের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত তাদের সিন্ডিকেট ও একাডেমিকভাবে হয়ে থাকে। তাই এ সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন। কিন্তু আমরা তাদের সঙ্গে আবারও একটি বৈঠক করবো।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিকা পায়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ১৮-এর বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়া যখন শুরু হয়, তার মধ্যে যাদের এনআইডি আছে তাদের নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে। তারা কী পাবলিক, প্রাইভেট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নাকি সাত কলেজের সেটা দেখা হয়নি। কাজেই যে কোনো শিক্ষার্থীর বয়স যদি ১৮ বছরের ওপরে হয়, তার এনআইডি থাকলে এখনি তিনি নিবন্ধন করতে পারেন। এখন তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা নিতে পারেন। যার এনআইডি নেই তার জন্যও বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম এবং আইডিসিআরের প্রতিনিধিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা অংশ নেন। গত বছর ৮ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ওই বছর ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দফায় দফায় ছুটি বাড়িয়ে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়। গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর তথ্য জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। মারণ ভাইরাসটির বিস্তার রোধে ওই বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর সংক্রমণ পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি না হওয়ায় দফায় দফায় ছুটি বাড়ানো হয়। চলতি বছরের শুরুর দিকে সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে কয়েক দফা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। গত ২৬ আগস্ট এক ঘোষণায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আরও এক দফা বাড়িয়ে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়। গত শুক্রবার দুপুরে চাঁদপুর সদর উপজেলার মহামায়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে খুলবে। আগের ঘোষণা অনুসারেই নভেম্বরে এসএসসি ও ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও অ্যাসাইনমেন্ট প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলেও ওইদিন জানিয়েছিলেন দীপু মনি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *