সুখ

পলি তালুকদার

মায়ের যখন ৩য় বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ১৬ বছর ! আমি আমার মাকে ছোট থেকেই খুব ভালবাসতাম ,কিন্তু কেন জানি না মায়ের এই ৩য় বারের বিয়েটা আমি মেনে নিতে পারিনি ! এই ৩য় বারের বিয়ের জন্য আমি মা কে খুব ঘৃণা করতাম ! তবে সেটা মনে মনে ,মুখে খুব কমই তার প্রতিফলন হতো ! এই দুনিয়াতে মা আর রাসেদ ছাড়া আমার আর কোন আপন লোক নেই ! যে লোকটার সাথে মা ৩য়,বার বিয়ে করেন তার নাম রাসেদ!কেন জানি না এই লোকটাকে আমার বাবা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না !

আমি যখন মায়ের পেটে তখন আমার ১ম বাবা নাকি মারা যান! যদিও আমি সবটা ঠিকঠাক জানি না ,কি করে বাবা মারা গেলেন ! তবে লোকমুখে শুনেছি বাবা আর মা নাকি ভালবেসে বিয়ে করেছিল ! পুরো ৫ বছর সম্পর্কের পর তারা গোপনে বিয়ে করেছিল ,কারণটা ছিল বাবা বেকার আর দরিদ্র পরিবারের ছেলে তাই আমার নানা-নানী কেউ মায়ের সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেন নি ! মা নানার একমাত্র মেয়ে খুব আদরের ,তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভাল ! তাই মা আর বাবা পালিয়ে বিয়ে করে !

বিয়ের ঠিক ১ বছর পর আমি মায়ের গর্ভে আসি ! শুনেছি মা যখন ৩ মাসের অন্তঃস্বত্তা ,বাবা তখন কোন একটা কাজে আমাদের একা ফেলে চলে যায়,তারপর আর কখনো ফিরে আসেন নি ! এর ঠিক ৫ মাস পর নাকি মায়ের কাছে খবর আসে যে বাবা বেঁচে নেই ,যদিও মা বাবার মুখটাও শেষ বারের মতো দেখতে পায় নি ! লোকমুখে শুনেছি খবরটা নাকি মিথ্যা ছিল ! আমি কিংবা মা কথাটার সত্য মিথ্যা কতোটুকু আজও খুঁজে পাই নি ,আর না তো বাবা কখনো আমাদের খোঁজ নিয়েছে !

আমার যখন ৩ বছর বয়স তখন মা ২য় বারের মতো বিয়ে করেন ! যদিও এই বিয়েটা মা আমার জন্যই করেছিল ! আমার ২য় বাবার নাম জাহেদ ! উনি আমাকে খুব ভালবাসত ! ছোট থেকে আমি ওনাকেই বাবা ডেকেছি ! মা তাই আমার সুখের জন্য তাকে বিয়ে করে ! আমার এই বাবাটা খুব ভাল ছিল ,আমার আর আমার মায়ের খুব খেয়াল রাখত ! মায়ের মুখে শুনেছি তিনি নাকি আমি মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মা কে অনেক সাহায্য করেছিল ! মা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিল ! মায়ের যখন ১ম বিয়ে হয়,তখন মায়ের বয়স ১৭ বছর ! আমাকে নিয়ে মায়ের কাজ করতে খুব কষ্ট হতো! তবুও জীবন বাঁচাতে মা ছোট্ট একটা চাকরি নেয় ,তাতে আমাদের সংসার কোনরকম এ চলে যেত!

আমি নাকি ছোট বেলায় আমার ২য় বাবা কে ,বাবা বলে ডাকতাম ! সবচেয়ে বেশি শান্ত আমি তার কোলেই থাকতাম ! আমাদের ছোট্ট সংসারটা ভালই চলছিল ! আমার যখন ৫ বছর বয়স তখন আমার ছোট্ট একটা ভাই আসে ! আমি তার নাম রেখেছিলাম ইফতি ! ইভার ভাই ইফতি ! কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট পরিবারে এত সুখ বিধাতার সহ্য হয়নি ! ইফতির যখন ৩ মাস বয়স তখন সে টাইফয়েডে মারা যায়! ইফতির মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম আমি ! আমার সেসব স্মৃতি খুব ভাল মনে নেই তবে ইফতির মুখটা আমার স্পষ্ট মনে আছে ওর সেই হাসিটা এখনো আমার চোখে ভাসে ! ইফতিকে হারিয়ে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলো ! হাসিখুসি ভরা পরিবারটা যেন মুহূর্তে কালো মেঘে ঢেকে গেল! ইফতির মৃত্যুর ঠিক ২ মাস পরে আমার ২য় বাবা ও একটা রাস্তা দূর্ঘটনায় মারা যান ! বাবার মৃত্যুতে আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম !

বাবার লাশটার সামনে এসে শুধু বাবাকে বলেছিলাম ,” আমার আর চকলেট লাগবে না,তুমি ওঠো” কিন্তু বাবা আর উঠল না ! বাবা ও আমাদের ছেড়ে ইফতির কাছে চলে গিয়েছিল ! বাবার মৃত্যুর পর বকবক করে পাগল করা এই আমিটা হয়ে যাই নিস্তব্ধ ! সেই থেকে আমি চুপচাপ স্বভাবের হয়ে যাই!

এরপর আমাদের সংসারটা মায়ের বাসা বাড়িতে কাজের টাকা দিয়ে কোনরকমে চলে যায়! কখনো ৩ বেলা বা কখনো ২ বেলা খেয়ে দিন কাটাতাম ! বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বলটুকোও হারিয়ে ফেললাম আমার পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে ! শেষ পর্যন্ত আমার পড়াশোনা বন্ধ হবার উপক্রম ! মা কে একবার বলেছিলাম নানাকে জানাতে ! মা না করে দিয়েছিল ,২য় বার আমি আর মা কে এ ব্যাপারে কিছু জিঙ্গেস করিনি ! আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিকে উঠব তখন ভর্তির টাকাটাও ছিল না ! মা কে বললাম থাক আর পড়াশোনা করব না ! মা বলেছিল তোকে আমার মতো হতভাগী হতে দেব না ,দরকার হলে কিডনি বিক্রি করব ! তবে মা কে তা করতে হয় নি ,রাসেদ সাহেব মা কে আমার ভর্তির টাকাটা দেন ! তা দিয়েই আমি ভর্তি হই !

অনেক টাকার মালিক রাসেদ সাহেব কেন জানি না মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় ! রাসেদ সাহেবের কোন সন্তান নেই ,স্ত্রী গত হয়েছেন ৩ বছর হলো ! মা আমাকে এসে বলল,” রাসেদ সাহেব আমাকে বিয়ে করতে চায়,তোকেও মেয়ে বলে মেনে নেবে ,কি করব?” কথাটা বলতে গিয়ে মায়ের মুখটা লজ্জায় নিঁচু হয়ে গেল ! আমি দেখলাম মায়ের,দু’গাল বেয়ে অঝরে পানি পরছে ! আমি বললাম ,” বিয়েটা করো ” ! মা আমার দিকে একবার তাকিয়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে দরজা দিয়ে দিল ! আমি বাইরে থেকে মায়ের কান্নার আওয়াজ পেলাম ! আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের কাজে চলে গেলাম !

৩য় বার বিয়ের পর আমি মাকে কখনো আমার সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলতে দেখিনি ! যদিও রাসেদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালবাসেন তবুও লোকটাকে বাবা বলে মেনে নিতে পারি নি ! আমি যখন ঘুমিয়ে থাকি তখন মা আমার পায়ের কাছে এসে রোজ রাতে কাঁদে! আমি টের পাই কিন্তু কিছু বলিনা ! আমি জানি মা এই বিয়েটা করেছে আমাকে ভাল রাখতে তবুও, না আমি আর না তো মা সুখে আছি ! আমরা হয়তো ভাল আছি তবে সুখে নেই ! রোজ রাতে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি ,” সুখটা কি জিনিস? কোথায় থাকে”? সবার জন্য কি সুখটা নয়?” উত্তর মেলে না ! এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার চলে আসি একটু সুখের আশায়!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *