৯৮ ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনাল ও রহস্য

স্পোর্টস: ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে দুই প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক ফ্রান্স ও আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ফিফার প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্স, বিশ্বকাপের স্বপ্নদ্রষ্টা জুলেরিমেও ছিলেন ফ্রান্সের অধিবাসী। অথচ ৬৮ বছর ধরে বিশ্বকাপের শিরোপা অধরাই ছিল ফ্রান্সের। অন্যদিকে ফুটবলের তীর্থস্থান ব্রাজিলের সামনে ছিল পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতার হাতছানি। দুই দেশের ফুটবল ভক্তরা তখন জিনেদিন জিদান আর রোনালদোর দিকে তাকিয়ে। তবে এদিন ভক্তদের শেষ হাসিটা উপহার দিতে পেরেছেন জিদান-ই। আর ম্যাচ শেষে রোনালদোকে নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সেই ঘটনার ২২ বছর পরও সেই ম্যাচ রয়ে গেছে রহস্যজনক এক গোলক ধাঁধা। তারকা স্ট্রাইকার জিনেদিন জিদানের একক নৈপুণ্যে প্রথমবারের মতো ১৯৯৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নের খাতায় নাম লেখায় ফ্রান্স।

দেশকে বিশ্বকাপ উপহার দিয়ে ফ্রান্সের নায়ক বনে যান জিদান। আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন বনাম স্বাগতিকদের মধ্যকার ফাইনাল খেলাটি জমজমাট একটি ম্যাচ হবে বলেই ধরে নিয়ে ছিলেন বিশ্ববাসী। কিন্তু সে দিনের খেলা দেখে মনে হয়েছে এক জিদানকেই সামলাতে হিমশিম খেয়েছে সাবেক চ্যাম্পিয়নরা। কর্ণার থেকে পাওয়া বল দুই দুই বার হেড দিয়ে গোল করে প্রথমার্ধেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানেই শিরোপা জেতে স্বাগতিকরা। কিন্তু ঐ ম্যাচে ব্রাজিলের তারকা স্ট্রাইকার রোনালদোর ভূমিকা নিয়েই বিশ্বব্যাপী আলোচনা কম হয়নি।

ফাইনাল ম্যাচের কিছুক্ষণ আগে থেকে স্নায়ুরোগে ভুগছিলেন রোনালদো। তারপরও তাকে প্রথম লাইন আপে রাখা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।সেই সময়ের বিবিসির ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার জন মটসনের ভাষায়, ফাইনাল ম্যাচে রোনালদোকে খেলানো নিয়েই ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই নানা নাটকীয়তা মঞ্চস্থ হয়। তিনি বলেন, সেই সময়ে আমার রিপোর্টার সহকর্মী ধারাভাষ্য বক্সের সামনে পেলেকে দেখতে পেয়ে জানতে চায়Ñকী ঘটছে? জবাবে পেলে বলেছিলেন, আমি কিছুই জানি না। শেষ পর্যন্ত স্নায়ুরোগ নিয়েই মাঠে নামেন রোনালদো। কিন্তু মাঠে রোনালদোর কোনো প্রতিচ্ছবি-ই খুঁজে পায়নি দর্শক। কিন্তু আগের দিন রাতেই হোটেল রুমে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন রোনালদো।

কয়েক মিনিটের জন্য অজ্ঞানও ছিলেন। তাকে হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছিল। ঐ ঘটনার ১৬ বছর পর ২০১৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে রোনালদো বলেন, আমাকে তিন ঘণ্টা হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সেখানে আমার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, আমাকে ওষুধ দেওয়া হয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর কোনো পরিসমাপ্তি মেলেনি। সেবার আমার এমন খিঁচুনি হয়েছিল যা আগে কখনোই হয়নি। ফাইনাল ম্যাচের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষ দলের সবচেয়ে বড় তারকা খেলোয়াড়ের এমন অসুস্থতা তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। ফ্রান্সের তারকা খেলোয়াড় এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপের অন্যতম কর্তা, আয়োজক কমিটির যুগ্ম প্রধান মিশেল প্লাতিনিও ২০১৮ সালে বলেছেন, ফ্রান্সকে চ্যাম্পিয়ন করতে আগে থেকেই তারা কিছু অসৎ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

ড্র তে ব্রাজিল ও ফ্রান্সকে এমন জায়গায় রেখেছিলেন, ফাইনালের আগে যাতে কোনোভাবেই ব্রাজিলের মুখোমুখি না হতে হয়। সেইভাবেই সব কিছু সাজিয়েছিলেন তারা। ফাইনাল ম্যাচে খেলতে আসার বাসেও ব্রাজিলিয়ানদের সবার মধ্যে উৎকণ্ঠা ছিলÑরোনালদোকে খেলায় পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। বাসে সবাই ছিলেন নিরব। কোনো উত্তেজনা ছিল না কারো মধ্যে।

ফাইনাল ম্যাচের আগে পুরো ব্রাজিল দলকেই নিষ্প্রাণ মনে হয়েছে। ফাইনালে খেলতে নামা একটি দলের এমন নিষ্প্রাণ চেহারা এবং বিমর্ষ পারফরম্যান্স মানুষকে আজো ভাবায়। তাই ফাইনালের আগের রাতে বিপক্ষ দলের তারকা খেলোয়াড়ের এই অসুস্থতা এবং মাঠে তার পারফরম্যান্স রহস্যের ধূ¤্রজাল হয়েই রয়ে গেছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *